ছবি: সংগৃহীত
সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। যেখানে ২ হাজার ৩২০ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ। সেই আসনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক নিজের পরাজয়ে ষড়যন্ত্র দেখছেন।
গত শুক্রবার (২০শে ফেব্রুয়ারি) ঠিকানা টিভির বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ কারণে তিনি পরাজিত হয়েছেন। ভোটে তার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে, সেখানে বিদেশি শক্তিও জড়িত ছিল, অভিযোগ করেন তিনি।
এক ভিডিওতে দেখা যায়, খেলাফত মজলিস নেতা মামুনুল হক আরও বলেন, ‘আমার আসনে স্বচ্ছতার সঙ্গে ভোটের আয়োজন হলে আমি মোটামুটি একটি ব্যবধানে জয়ী হতাম। কিন্তু সেনাবাহিনীর একটি অংশ চেয়েছিল আমি যাতে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হই। তাদের সঙ্গে গেলে আমিও এমপি হতাম, মন্ত্রী হতাম, এমন প্রস্তাবই ছিল। কিন্তু এর বদলে আমি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে হারিয়ে দিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।’
গত শুক্রবার রাতে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যা নিউইয়র্ক সময় বেলা সাড়ে ১১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১০টা) সরাসরি সম্প্রচারিত হয় ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের সমসাময়িক রাজনীতির নানা বিষয়ে ঠিকানা টিভির প্রধান সম্পাদক খালেদ মুহিউদ্দীনের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক।
বিএনপি জোটের তুলনায় জুলাই বিপ্লবের চেতনা বেশি ধারণ করেছে জামায়াতের নেতৃত্বে থাকা ১১ দলীয় জোট, সেই কারণে খেলাফত মজলিস ১১ দলীয় জোটে রয়েছে, এমন মন্তব্য করেন মামুনুল হক। তিনি আরও বলেন, ‘আমি জোটবদ্ধ হতে সময় নিয়েছিলাম। কারণ আমার লক্ষ্য ছিল এনসিপি যেদিকে যায়, সেদিকে যাওয়া। তারা ১১ দলীয় জোটে থাকায় আমার চাওয়াটা পূর্ণ হয়েছে।’
নির্বাচনের পরও এই জোট জুলাই চেতনাকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ থাকবে বলে মনে করেন তিনি। ‘জুলাই বিপ্লবকে আইনিভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সাংবিধানিকবাবে যতভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের জোট সক্রিয় থাকবে’ - বলেন খেলাফত মজলিস নেতা মামুনুল হক।
সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইসলামপন্থি দলগুলো একধরনের প্রভাবশালী ভূমিকায় ছিল বলে স্বীকার করেন মামুনুল হক। কিন্তু এই দেড় বছরে যেভাবে হিন্দু সম্প্রদায়, মাজার ও বাউলপন্থিরা আক্রান্ত হয়েছেন, তার দায় নিতে রাজি নন তিনি।
উল্টো মামুনুল হক দাবি করছেন, ‘এই সময় হিন্দুরা অনেক নিরাপদে ছিল। মাজার ও বাউল আখড়ায় হামলার যে ঘটনার কথা বলা হয়, সেটা ঘটনার তুলনায় বেশি বলা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে।’
এদিকে বাংলাদেশের উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী, বা ‘আটকে পড়া পাকিস্তানিদের’ আদর্শগতভাবে নিজের খুব কাছাকাছি বলে মনে করেন খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোগে আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি যে, আদর্শগতভাবে তারা আমার খুব কাছাকাছি। আমি তাদের খুব কাছাকাছি। সেই জায়গাটা থেকেও আমি তাদের সমর্থনপ্রত্যাশী।’
মামুনুল হকের দাবি, ‘অবাঙালি বা উর্দুভাষী একটা বিশাল জনগোষ্ঠী, তাদের মধ্যে ধর্মচর্চার মাত্রাটা অন্যদের চেয়ে বেশি। তারা অনেকটাই ধর্মভীরু। মোহাম্মদপুর (ঢাকা) এলাকায় প্রায় সাতটা বিহারি ক্যাম্প আছে। এ ক্যাম্পের বাইরেও পুরো এলাকা জুড়েই অনেক বিহারি অধিবাসীদের এখানে বসবাস। অনেক বড় সংখ্যক একটা ভোটার। আমি আশা করছি যে, আদর্শগতভাবে তারা আমার খুব কাছাকাছি।’
দৈনিক বণিক বার্তাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মামুনুল হক এসব কথা বলেন। তার বিশেষ সাক্ষাৎকার বণিক বার্তার ছাপা সংস্করণে গত ২৭শে জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটির লিংক ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনের মধ্যে মামুনুল হকের বক্তব্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলে।
মামুনুল হক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে রিকশা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বণিক বার্তার সাংবাদিক আনিকা মাহজাবিন।
এদিকে, গত বছরের ১৭ই এপ্রিল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ সভায় (এফওসি) বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী পররাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিন পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধিকে বাংলাদেশে ‘আটকে পড়া পাকিস্তানিদের’ প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য অনুরোধ জানান।
তবে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীকে ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ অভিহিত করে পররাষ্ট্রসচিবের দেওয়া ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান দেশের ৩০ নাগরিক। তখন এক বিবৃতিতে তারা এ আহ্বান জানান।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির আগে ও পরে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর পূর্বসূরিরা ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায় বসতি স্থাপন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক কমিটি ফর রেডক্রসের (আইসিআরসি) সহায়তায় এ জনগোষ্ঠীকে দেশের বিভিন্ন জেলার ১১৬টি ক্যাম্পে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ২০০১ সালের এক রিট আবেদনের রায়ে হাইকোর্ট বাংলাদেশের উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বের প্রশ্নের মীমাংসা করেন এবং এই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান ও ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করেন। ওই রায়ের আলোকে বাংলাদেশের উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নাম যথাযথভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাদেরকে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়।
খবরটি শেয়ার করুন