ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
কুমিল্লায় রাজনৈতিক কর্মসূচির মিছিলে কথিত কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনের উপস্থিতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গত বুধবার বিকেলে কুমিল্লা নগরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে ধর্মসাগর পাড় সড়কে ওই মিছিল হয়। মিছিলটির নেতৃত্বে ছিলেন কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিন। ভিডিওতে তার ঠিক পেছনে রতনকে হাঁটতে দেখা যায়।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। ২০১৫ সালের পর থেকে নগরীতে একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রতন গ্রুপ অন্যতম। আধিপত্য বিস্তার, মারামারি, অস্ত্রের মহড়া, মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রুপটির সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাংগুলো নিজেদের আধিপত্য জানান দিতে প্রকাশ্যে সহিংসতায় জড়াচ্ছে বলেও ওই প্রতিবেদনে স্থানীয় সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক মিছিলে কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানের উপস্থিতির বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অপরাধের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে ঢুকে পড়ছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে মিছিলে রতনের উপস্থিতির সঙ্গে তার কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ছিল—এমন দাবি করেননি ছাত্রদল নেতা মো. মহসিন।
মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে মহসিন বলেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি অনুসারীদের নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। মিছিলে অনেক মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে কে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বা কে অপরাধী, তা তার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি।
মহসিন বলেন, ‘এত মানুষের ভিড়ে কে সন্ত্রাসী, কে কিশোর গ্যাং লিডার বা কে মাদক ব্যবসায়ী—তা ব্যক্তিগতভাবে চেনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
রতনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার কোনো দিন কোনো ধরনের ওঠাবসা, চা খাওয়া কিংবা আশ্রয় দেওয়ার প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবেন না। এটি ছিল কেন্দ্রীয় কর্মসূচি। ব্যক্তিগত কোনো কর্মসূচি ছিল না।
ছাত্রদল-বিএনপিতে কিশোর গ্যাংয়ের অনুপ্রবেশের অভিযোগের বিষয়ে মহসিন বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা রাজনৈতিক সংগঠনে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। তবে ছাত্রদল তাদের প্রশ্রয় দেয় না। অজান্তে কোনো কর্মসূচিতে এমন কেউ ঢুকে পড়তে পারে। তাদের শনাক্ত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।
সুখবর ডটকমকে মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নাহিদুজ্জামান রানা বলেন, তারা সব সময় কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন। ভিডিওটি নজরে আসার পর তিনি মহসিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। মহসিন জানিয়েছেন, রতন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত—এ বিষয়টি তিনি জানতেন না।
রানা বলেন, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছেন। মহসিনের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রতন গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানও নতুন নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে কুমিল্লা নগরে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ার পর সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের অভিযানে কয়েক দফায় বহু ব্যক্তিকে আটক করা হয়। ২৭ এপ্রিল সেনাবাহিনী ও র্যাবের যৌথ অভিযানে অস্ত্র ও মাদকসহ নয়জনকে গ্রেপ্তারের খবর দেয় বিভিন্ন গণমাধ্যম।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে ওই সময় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তালিকায় ইমরান হোসেন রতনের নামও ছিল। অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও মাদক উদ্ধারের কথা জানানো হয়।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ধর্মসাগরপাড়ের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময় নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রতন গ্রুপের তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রতন বর্তমানে জামিনে আছেন। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, রতনকে গ্রেপ্তারের জন্য কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। তবে তিনি পালিয়ে গেছেন।
কুমিল্লার ঘটনা অবশ্য বিচ্ছিন্ন নয়। রাজধানীতেও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। সাম্প্রতিক এক অভিযানে ঢাকার তেজগাঁও, কলাবাগান, গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর ও ডেমরা এলাকায় ছয়টি কিশোর গ্যাংয়ের ৩৪ সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে র্যাব। তাদের কাছ থেকে ধারালো অস্ত্র ও মুঠোফোন উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।
মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শ্যামলী এলাকাতেও বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছে। ‘বিডিএসকে’ নামের একটি গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও যৌন হয়রানির অভিযোগের কথা জানিয়েছে র্যাব। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, শ্যামপুর ও কদমতলী এলাকায় ‘জালাল বাহিনী’র সদস্যদের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও যৌন হয়রানির অভিযোগে আটজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
চট্টগ্রামেও একই চিত্র দেখা গেছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ছয়টি গ্রুপের ৩৩ সদস্যকে আটকের কথা জানিয়েছিল র্যাব। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা বলা হয়।
সিলেটেও কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে নগরের বালুচর এলাকা থেকে কথিত কিশোর গ্যাং লিডার বুলেট মামুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ ১১টি মামলা রয়েছে।
বরিশাল ও রাজশাহীতেও সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছে। বরিশালে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কথিত কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানসহ চারজনকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়। রাজশাহীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সূত্র ধরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় বলেছেন, এসব গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় ‘বড় ভাই’ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদ থাকে। সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে র্যাব-১-এর অধিনায়কও বলেছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের যারা প্রশ্রয় দেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
কুমিল্লার মিছিলের ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াতেও মূলত একই প্রশ্ন সামনে এসেছে। অনেকে জানতে চেয়েছেন, যেসব ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে, তারা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কীভাবে প্রকাশ্যে উপস্থিত হচ্ছেন। কেউ কেউ রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। আবার অনেকে বলেছেন, শুধু একটি ভিডিওতে কারও উপস্থিতি দেখেই তাকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। অভিযোগ ও মামলার বিষয়গুলোও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
তবে বিষয়টি যে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও অস্বস্তির, তা স্পষ্ট। কারণ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলার মধ্যেই কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কথিত গ্যাং নেতার দৃশ্যমান উপস্থিতি সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
কুমিল্লার এই ভিডিও তাই শুধু একটি মিছিলের দৃশ্য নয়। এটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অপরাধের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের প্রবেশ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান—তিনটি বিষয়কেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কে আসছেন, সেটি কি আর শুধু ভিড়ের অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় থাকবে, নাকি দলগুলোও নিজেদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি করবে?
খবরটি শেয়ার করুন