ফাইল ছবি
শায়লা শবনম
‘বাংলাদেশ’ এবং ‘আওয়ামী লীগ’। এই নাম দুটি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালে। আর বিশ্ব মানচিত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেই যুদ্ধে প্রধান ভূমিকা পালন করে আওয়ামী লীগ। এই দলটি ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ এ দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দলটির সভাপতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগের পর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে যান, কেউ কেউ আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। একই সঙ্গে দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক পুনর্গঠন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়।
গতকাল ছিল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তবে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় অনলাইনে এবং সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে সীমিত পরিসরে ছোট সমাবেশ, দোয়া ও শ্রদ্ধা নিবেদনের চেষ্টা করেন দলটির নেতাকর্মীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি ও অভিযানের কারণে অনেক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয় এবং বেশ কিছু নেতাকর্মী আটকও হন।
দলটির কর্মী-সমর্থকদের মতে, যে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা পুনরায় সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, দলটির সামনে আস্থা পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার করা এবং জনগণের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ এ দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পুনর্বিন্যাসের পর্যায়ে থাকা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আলোচিত।
আওয়ামী লীগের রাজনীতি এ দেশের শেকড়ে প্রোথিত থাকলেও দলটিকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। একদিকে দলটির বিরুদ্ধে গণতন্ত্র, নির্বাচন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে; অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝা সম্ভব নয়। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে অভ্যন্তরীণ যে রাজনৈতিক লড়াই চলছে, এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জিতবে কে? আওয়ামী লীগ, নাকি সেই রাজনৈতিক ধারা, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধিতার অভিযোগ রয়েছে?
বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের ইতিহাসও অনেক পুরোনো। আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে এ দেশের গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সংখ্যা খুব বেশি নয়। স্বাধীনতার পর সামরিক শাসন, আধা-সামরিক শাসন কিংবা দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অধিকাংশ নির্বাচনই কোনো না কোনো বিতর্কে আক্রান্ত হয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত গণভোট, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কিংবা সংসদ নির্বাচন নিয়েও তখন প্রশ্ন ছিল। পরবর্তীতে এরশাদের আমলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। চারটি নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়েছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এতটাই গভীর ছিল যে নিরপেক্ষ ব্যবস্থার বাইরে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিএনপি সরকার সেই নির্বাচন আয়োজন করলেও বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সরকারকে সরে দাঁড়াতে হয় এবং পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্ষমতা হারানোর পর বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি; তারা পরবর্তী নির্বাচনেও পূর্ণমাত্রায় অংশ নিয়েছিল।
একইভাবে ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। সে সময় দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল।
২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব ঘটে। প্রায় দুই বছর পর অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর শুরু হয় আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকাল। এ সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং সামাজিক সূচকে সাফল্যের পাশাপাশি নির্বাচন ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে সমালোচনাও ক্রমশ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, নির্বাচনী মাঠে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়নি। তবে বর্তমান বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—আওয়ামী লীগকে রাজনীতির বাইরে রেখে কি একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্ভব?
এ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; এটি স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক সংগঠন। ফলে দলটির জনপ্রিয়তা কমতে পারে, সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু তাকে পুরোপুরি রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী বিরোধী শক্তি। রাজনৈতিক ভারসাম্য ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ থাকতে পারে; কিন্তু সেই অসন্তোষের সমাধান রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত, কোনো পক্ষকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দেওয়ার মাধ্যমে নয়।
রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখনই একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ দিয়ে ক্ষমতার সমীকরণ গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে, তখনই অস্থিরতা বেড়েছে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের শূন্যতা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না; সেটি অন্য কোনো শক্তি এসে পূরণ করে। অনেক ক্ষেত্রেই সেই শক্তি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নাও হতে পারে।
আজকের বাংলাদেশে তাই মূল প্রশ্ন আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যাবে, নাকি ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের দিকে এগোবে? রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, মতভেদ থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক শাসন এবং বহুত্ববাদ—অক্ষুণ্ন থাকবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা যায়, করা উচিতও। কিন্তু একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করে। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য যেমন আওয়ামী লীগের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতিরও।
এ দেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক দলের হাতে নিরাপদ হবে না। নিরাপদ হবে তখনই, যখন নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হবে উন্মুক্ত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করবে। তবে এটাও সত্য যে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ দিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। সার্বিক প্রেক্ষাপটে দেশে গত প্রায় দুই বছর ধরে রাজনৈতিক যে লড়াই চলছে, তা কেবল কোনো দল ক্ষমতায় যাবে কি না, সেই প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি তার বহুদলীয় রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে পারবে, নাকি আরও গভীর বিভাজনের দিকে এগোবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, শেষ পর্যন্ত জিতবে কে—কোনো রাজনৈতিক দল, নাকি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন