দেশের সংবাদপত্র জগতে একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পাঠকপ্রিয়তা অর্জনকারী দৈনিক জনকণ্ঠ আজ অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত। এই লড়াই কেবল বাজার কিংবা পাঠকসংকটের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের চরম কোন্দল, দখল-রক্ষা এবং পেশাদার সাংবাদিকতার নীতিনির্ধারণকে ঘিরে এক জটিল বাস্তবতা। একদিকে নিয়োগ, ছাঁটাই, ও মালিকানা নিয়ে চলছে দফায় দফায় বিরোধ; অন্যদিকে সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি জনকণ্ঠ ভবনে রীতিমতো উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শুরু হওয়া এই অস্থিরতা এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে—যেখানে সম্পাদককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে নিজেদের মধ্যে গঠিত 'সম্পাদকীয় বোর্ড' দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে পত্রিকাটি।
জনকণ্ঠের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; বরং এটি দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশাদার সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে বলে মনে করেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও সংবাদকর্মীদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা চলছে, এর প্রভাব কোনো না কোনোভাবে জনসাধারণের সংবাদপ্রাপ্তির অধিকারের ওপরও পড়ছে। জনকণ্ঠের এই অভ্যন্তরীণ দখল-রক্ষা লড়াই একটি বড় ধরনের সাংবাদিকতা সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গতকাল রোববার (৩রা আগস্ট) বিবিসি বাংলার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জনকণ্ঠের এই সংকট উদঘাটিত হয়েছে, যা নিয়ে সংবাদমাধ্যম অঙ্গনে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
মালিকপক্ষ বনাম বিদ্রোহী কর্মীগ্রুপ
গত বছরের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জনকণ্ঠে নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েক সাংবাদিক গত শনিবার (২রা আগস্ট) সম্পাদক শামীমা এ খানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। এর আগে তাদের কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করেছিল মালিকপক্ষ। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে এই গ্রুপটি জনকণ্ঠ ভবনে অবস্থান নিয়ে মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানায় মামলা দায়ের করে।
সম্পাদক শামীমা এ খান অভিযোগ করেছেন, 'ষড়যন্ত্র করে জনকণ্ঠ ভবনে মব সৃষ্টি করে অবৈধ দখল নিয়েছে' বিদ্রোহী কর্মীদলটি। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) অবসরপ্রাপ্ত মেজর আফিজুর রহমান, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জনকণ্ঠের প্ল্যানিং অ্যাডভাইজর জয়নাল আবেদীন শিশিরসহ বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কয়েকজন সাংবাদিক।
যা বলছেন সাংবাদিকরা
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল গতকাল ফেসবুকের এক পোস্টে বলেন, 'দৈনিক জনকণ্ঠ নিয়ে সকাল থেকেই নানা খবর পাচ্ছি। পত্রিকাটির অনলাইনে গিয়ে দেখি- প্রিন্টার্স লাইন পাল্টে গেছে। সম্পাদক বা প্রকাশকের নামই নেই। এর পরিবর্তে সম্পাদকমন্ডলী লেখা! একটা নিউজের শিরোনাম এমন- ফ্যাসিবাদমুক্ত করা হয়েছে জনকণ্ঠ। এই নিউজের মধ্যে একটা পরিচালনা বোর্ড গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এখন থেকে তারাই নাকি পত্রিকাটি চালাবে। তারা কারা? যতদূর বুঝলাম- এনসিপি, জামায়াত, বিএনপি সবাই আছে এখানে।'
তিনি লেখেন, 'জনকণ্ঠ একটা ব্যক্তিমালিকানধীন প্রতিষ্ঠান। ঢাকার ইস্কাটনের বিশাল এই ভবনে জনকণ্ঠ ছাড়াও মালিকের আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। কোনো পত্রিকা ফ্যাসিবাদের দোসর হলে, কোনো অপরাধ করলে তার বিচারের জন্য বিধিবদ্ধ কিছু আইনকানুন আছে। কিন্তু এভাবে জবরদখল করা যায়? ওখানে আসলে ঠিক কী ঘটেছে, কেন ঘটছে- ঠিক বুঝতে পারছি না। খোঁজখবর নিচ্ছি।... জনকণ্ঠের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। এ পত্রিকার শুরু থেকে টানা ১২ বছর আমি সেখানে ছিলাম। তাই ঘটনাগুলো আমাকে বিচলিত করছে।'
প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক (ডিজি) সাংবাদিক ও লেখক ফারুক ওয়াসিফ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, 'জনকণ্ঠের যে ২০ জন সাংবাদিককে সম্পূর্ণ অন্যায্য কারণে চাকরিহারা করা হলো, তারা আর আগের মতো অসহায় হয়ে থাকতে চাননি। এতটুকু, এই এতটুকু সাহস আর আত্মমর্যাদা জুলাইয়েরই অর্জন। রাষ্ট্র কাজে জুলাই ততটা সফল না হলেও, মানুষকে মানুষের মতো বাঁচার প্রেরণা হওয়ায় জুলাই সফল। তাই জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের চাকরি খাওয়া যাবে না।'
তিনি বলেন, 'কে কালো কে লাল তার সাথে অন্যায়ভাবে চাকরি খাওয়ার সম্পর্ক নেই। মতামতের জন্য চাকরি যেতে পারে না নতুন বাংলাদেশে। জনকণ্ঠের ইতিহাস ও বর্তমান আমরা জানি। এক্সপ্লোর জনকণ্ঠের অন্দরমহল। কিন্তু কোনোরকম মবগিরি সমর্থন করি না। মবগিরি আন্দোলন ও ঐক্য নষ্ট করে দেয়।'
দখল না ‘সংস্কার’? দুই মেরুতে দুই ভাষ্য
অভিযুক্ত আফিজুর রহমান এবং শিশির বিবিসি বাংলাকে দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তারা কোনো মালিকানা বা প্রকাশনার দায়িত্বে নেই, বরং কর্মরত সাংবাদিকদের সম্মতিক্রমে একটি পরিচালনা বোর্ড গঠন করেছেন। শিশির বলেন, ‘সম্পাদকের পদে থাকা ব্যক্তিকে আমরা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছি। তিনি প্রকাশক হিসেবে থাকবেন, তবে তার দুই ছেলেকেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।’
ব্যানার লাল-কালো, সম্পাদক সরিয়ে নতুন ঘোষণাপত্র
শনিবার রাত থেকে জনকণ্ঠের অনলাইন সংস্করণে আর দেখা যাচ্ছে না সম্পাদক ও প্রকাশকের নাম। তার বদলে লেখা হচ্ছে- ‘সম্পাদকমন্ডলী কর্তৃক গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের সদস্য প্রতিষ্ঠান গ্লোব প্রিন্টার্স লি. ও জনকণ্ঠ লি. থেকে প্রকাশিত।’ নতুন ঘোষণাপত্রের এই পরিবর্তনই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে।
জনকণ্ঠ ভবনে উত্তেজনা ও ‘মব সৃষ্টির’ অভিযোগ
মালিকপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ‘মব সৃষ্টি করে জনকণ্ঠ ভবনের একাধিক ফ্লোরের চাবি নিয়ে যাযন বিদ্রোহী কর্মীরা।’ শামীমা এ খান বলেন, ‘তারা আমাকে ও আমার সন্তানদের নিষিদ্ধ করেছে। পুলিশের সহায়তা চেয়েও পাইনি।’ অপরদিকে চাকরিচ্যুত কর্মীদের দাবি, পত্রিকাটি চালিয়ে নেওয়া ও সাংবাদিকদের বকেয়া বেতন আদায়ের জন্য তারা বাধ্য হয়েই সম্পাদকীয় বোর্ড গঠন করেছেন।
ডিজিএফআই কর্মকর্তা থেকে জনকণ্ঠের 'পলিটিক্যাল শিফট'
বিবিসির প্রতিবেদন অনুসারে, আওয়ামী লীগের পতনের কিছুদিন আগেই আফিজুর রহমান সিওও হিসেবে জনকণ্ঠে যোগ দেন। মালিক পক্ষের অভিযোগ, তার মাধ্যমেই বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি ঘরানার ব্যক্তিরা পত্রিকায় ঢুকে পড়ে। এমনকি একজন বিএনপি নেতার স্ত্রীকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয় বলে দাবি করেছেন শামীমা এ খান।
অতীতের আলো, বর্তমানের ছায়া
১৯৯৩ সালে আতিকউল্লাহ খান মাসুদের প্রতিষ্ঠিত জনকণ্ঠ মুক্তিযুদ্ধপন্থী অবস্থান ও 'সেই রাজাকার' শিরোনামে ধারাবাহিক প্রকাশনার মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করে। কিন্তু বর্তমানে সেটি পরিচিতি হারিয়ে পেশাদারিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে। একসময় পাঠকের আস্থা অর্জনকারী এই পত্রিকা এখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে লিপ্ত।
খবরটি শেয়ার করুন