রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’ *** ডেঙ্গু রোগী বেশি পিরোজপুরে, যে কারণ জানালেন প্রতিমন্ত্রী

‌‘শেখ হাসিনার আমলে ডন সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ততোটা ছিল না’

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ০৪:১১ অপরাহ্ন, ১৪ই মে ২০২৬

#

প্রতীকী ছবি

সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি সম্প্রতি এক ভিডিও বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা নিয়ে একাধিক বিতর্কিত কিন্তু আলোচিত মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে আন্ডারওয়ার্ল্ড সংস্কৃতি, আর্থিক খাতে দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক নিয়োগে আনুগত্য ও অর্থের প্রভাব, তথাকথিত ‘মব কালচার’, এবং বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি সংকটের মতো বিষয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ তার বক্তব্যকে বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, তিনি রাজনৈতিক হতাশা ও জনঅসন্তোষকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করেছেন।

ভিডিও বক্তব্যে গোলাম মাওলা রনি বলেন, শেখ হাসিনার আমলে চাঁদাবাজি থাকলেও “প্রকাশ্য ডনগিরি” বা সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটভিত্তিক ডন সংস্কৃতি এতটা দৃশ্যমান ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেই সংস্কৃতি আবার নতুনভাবে ফিরে এসেছে। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়কার পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ওই সময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের কালা জাহাঙ্গীর, ডাকাত শহীদ, ডেভিডসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ধরনের প্রবণতা পুনরায় দেখা যাচ্ছে।

রনি তার বক্তব্যে আর্থিক খাতের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের সময় ব্যাংকপাড়াকেন্দ্রিক ‘বাকের’ নামে এক সিবিএ নেতার ব্যাপক প্রভাব ছিল। তার দাবি, বর্তমানে সেই ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তির সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। কোনো সরকারি ব্যাংকের সিবিএ নেতা, ডিএমডি কিংবা জিএম—রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে একেকজন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের “বাকের ভাই” হয়ে উঠছেন এবং এর ফলে পুরো আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে “মব কালচার” বেড়েছে। তার মতে, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে এখন তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে—টাকা, অযোগ্যতা ও আনুগত্য। এই তিনটি বিষয় ছাড়া দক্ষ কর্মকর্তাদের সামনে এগোনোর সুযোগ কমে যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার দাবি, ব্যাংক ও বীমাসহ পুরো আর্থিক খাতে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা বলছেন, রনির এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে। যদিও তার অভিযোগের অনেকগুলোর পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি, তবে সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তব্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় আনুগত্য ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একটি বড় বাস্তবতা। তবে এখন যেটা বেশি দৃশ্যমান, সেটা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট। যখন মানুষ মনে করে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন হতাশা বাড়ে।

তাদের মতে, গোলাম মাওলা রনির বক্তব্যে অতিরঞ্জন থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ ও অনাস্থার জায়গাগুলো তিনি ধরতে পেরেছেন বলেই আলোচনাটা বড় হয়েছে। ভিডিও বক্তব্যে রনি গণমাধ্যমের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য এখন গুরুত্ব পাওয়ার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের উপাদানে পরিণত হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্য এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।

তিনি বিশেষভাবে সরকারের সাবেক ও বর্তমান নীতিনির্ধারণী ব্যক্তিদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, অনেক সময় মিডিয়ায় উপস্থাপনার ধরন এমন ছিল, যাতে মানুষের বিরক্তি তৈরি হয়। তার মতে, এর ফলে জনগণের একাংশ সরকারের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ছে।

তবে গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে রাজনৈতিক বক্তব্যের দ্রুত ভাইরাল হওয়া এবং সেটি ট্রলের উপকরণে পরিণত হওয়া এখন বৈশ্বিক বাস্তবতা।আগে রাজনৈতিক বক্তব্য মূলত টেলিভিশন বা সংবাদপত্রের মাধ্যমে ছড়াত। এখন ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবসহ নানা প্ল্যাটফর্মে বক্তব্যের ছোট অংশ কেটে ভাইরাল করা হয়। ফলে বক্তব্যের মূল প্রেক্ষাপট অনেক সময় হারিয়ে যায়।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য মিম ও ট্রলের অংশ হচ্ছে। তবে এর ফলে রাজনৈতিক আস্থাহীনতা বাড়ছে—এটিও সত্য।

রনির বক্তব্যে প্রশাসনিক নিয়োগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে নিষ্ক্রিয় বা চাকরিচ্যুত হওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ নিয়ে নতুন করে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক পদ এখন কার্যত ‘টেন্ডার’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে অর্থ ও লবির প্রভাব বেশি কাজ করছে।

তিনি দাবি করেন, এই পরিস্থিতিতে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাও চাকরি হারিয়েছেন, আবার বিতর্কিত ব্যক্তিরাও গুরুত্বপূর্ণ পদে জায়গা পেয়েছেন। এর ফলে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রশাসনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন এলে কিছু মাত্রায় পুনর্বিন্যাস হয়। কিন্তু সেটি যদি নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে।  জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখনই, যখন প্রশাসনের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান অথবা রাজনৈতিক চাপের কারণে পেশাগত স্বাধীনতা হারান।

ভিডিও বক্তব্যে রনি রাজস্ব আদায়ব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জনগণের মধ্যে ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে। সম্প্রতি ভুয়া পরিচয়ে যাওয়া এক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, জনগণের ক্ষোভ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে প্রকৃত কর্মকর্তারাও একই ধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে পারেন।

এই মন্তব্য ঘিরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী রুবাইয়াৎ ইসলাম লিখেছেন, “রনি সাহেব যেটা বলেছেন, সেটা অনেকে বলতে ভয় পায়। সরকারি অফিসে সাধারণ মানুষ যে ভোগান্তির শিকার হয়, সেটি বাস্তব।”

আরেক ব্যবহারকারী মাহিন তানভীর মন্তব্য করেন, “সবকিছু নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করলে মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ে। সমালোচনা অবশ্যই দরকার, কিন্তু প্রমাণভিত্তিক আলোচনা হওয়া উচিত।”

এক্স (সাবেক টুইটার)-এ নেটিজেন সামিহা নওরীন লেখেন, “রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এখন সামাজিক মাধ্যমে সবকিছু দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে যাচ্ছে, তাই সংকটগুলো বেশি চোখে পড়ছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রনির বক্তব্যের জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক চাপও ভূমিকা রাখছে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সেবার দুর্বলতা নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ থাকায় এ ধরনের বক্তব্য সহজেই আলোচনায় আসে।

তবে কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক বক্তব্যে অতীত ও বর্তমানকে তুলনা করার ক্ষেত্রে ভারসাম্য জরুরি। কারণ, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রায় সব সরকারের আমলেই দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক নিয়োগ, আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা এবং গণমাধ্যমে তথ্য উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও পেশাদারিত্ব বাড়ানোর দাবি উঠছে।

গোলাম মাওলা রনির বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসন নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। আর সেই কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিও বক্তব্যও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে।

সিন্ডিকেট সংস্কৃতি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250