আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস উপলক্ষ্যে ‘এই জনপদে শরণার্থী সমস্যা: অতীত ও বর্তমান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা আজ ২০ জুন ২০২৩ মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ সোসাইটি ফর কালচারাল এন্ড সোশ্যাল স্টাডিজ (বিএসসিএসএস) এই আলোচনা সভা আয়োজন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিএসসিএসএস -এর সভাপতি ডা. সারওয়ার আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম। সাবেক সচিব ড. মিহির কান্তি মজুমদার আলোচনায় অংশ নেন। এছাড়া, অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিএসসিএসএস-এর কোষাধ্যক্ষ অনুপম রায়।
অধ্যাপক ড. সামাদ বলেন, যুগে যুগে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার হচ্ছে শরণার্থীরা। এই সমস্যা সমাধানে সবার আগে পরাশক্তি সম্পন্ন দেশগুলোকে মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করে কাজ করতে হবে এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা পরিহার করতে হবে। এছাড়া, স্থানীয়ভাবে শরণার্থীদের সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে এই সমস্যার সমাধানে কাজ করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ আরো বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ভালো থাকার জন্য আসে নি। প্রাণ রক্ষার জন্য, নিরাপত্তার জন্য এসেছে। যদি বাংলাদেশ ঢুকতে না দিত, তাহলে হয়তো অনেক রোহিঙ্গার প্রাণহানি হতো। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে চীন সেখানে রপ্তানির জন্য শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে জঙ্গীবাদ, মাদক ব্যবসা, সশস্ত্র গ্রুপসহ নানা সমস্যা বিরাজমান। এটি একটি টাইম বোমার মতো। বাংলাদেশকে এটা ধ্বংস করে দিতে পারে; এমন দিনও আসতে পারে।
অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম মূল প্রবন্ধে বলেন, বৃহৎ শরণার্থী ব্যবস্থাপনা ও প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক সফল উদাহরণ থাকলেও ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। মানবেতর জীবন যাপন করলেও মায়ানমার সরকার তাদেরকে সম্মানের সাথে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বিশ্ব সম্প্রদায় বিশেষ করে বৃহৎ শক্তিধরে রাষ্ট্রসমূহ অনেকটা নীরব।
তিনি আরো বলেন, বিশ্বব্যাপী ৬৮ মিলিয়ন শরণার্থী রয়েছে, তাদের মধ্যে এক মিলিয়ন আমাদের নিজস্ব উঠোনে বসবাস করেছে। বছরের পর বছর পার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছে। বিশ্বে আজ ১৪০ জনের একজন শরণার্থী হিসেবে জীবনপাত করেছে। রোহিঙ্গারা রাখাইনে নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন করলেই এই সমস্যার একটা টেকসই সমাধান হবে। কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, মুসলিম দেশ এবং ইউরোপ ভিত্তিক কিছু দেশ বলছে রোহিঙ্গাদেরকে কক্সবাজারের মানুষের সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। যাতে চলাচল ও কাজের সুযোগ পায়। কিন্তু এটা কখনোই সম্ভব না। বরং নতুন ধরণের সংঘাত তৈরি করবে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের ভূমিকার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর কালাচারাল এন্ড সোস্যাল স্টাডিজের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মুখে দরদ দেখিয়ে কোনো সাহায্য করেনি। ভারত একটা দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে তখনকার সময়ে নানা সমস্যার পরেও বাংলাদেশি শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে তাদের অর্থনীতি, দেশটির অখন্ডতা হুমকির মুখে পড়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারও প্রচন্ড চাপে পড়ে গিয়েছিল।
তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসটি নিয়ে আমাদের এখানে খুব একটা আলোচনা হয় না। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে আছে। বাংলাদেশ নিজেও ১২ লাখের মতো বাস্তুচ্যুত শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিয়েছে। শরণার্থী সমস্যাকে মানবিক সমস্যা বলা হলেও এর সাথে রাজনীতি জড়িত হয়ে যায়। রাজনীতি নির্ভর এসব মানবিক সমস্যায় মানবিকতার চাইতেও রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। সেই রাজনীতি সমস্যাকে সমাধানের অযোগ্য করে তোলে।
আইকেজে /