ছবি: সংগৃহীত
বিশিষ্ট সাংবাদিক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম বলছেন, আজ রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমদের চিরতরে চলে যাওয়ার দিন। রাজনীতির মঞ্চে তিনি ছিলেন কারও কাছে বিতর্কিত, আবার সমানভাবে আলোচিতও। কাছ থেকে দেখলে আরেকটি মানুষকে পাওয়া যেত, ভদ্র, বিনয়ী, কথায় ও আচরণে পরিমিত।
তিনি বলেন, একদা জাতীয় সংসদে মওদুদ ও তোফায়েল আহমেদের তুমুল বিতর্ক হতো। দুই-চার দিন তাদের কথা বন্ধ থাকত। তারপর আবার একসঙ্গে চলতেন, গল্প করতেন। দু’জন আলাপ করে সংসদ জমিয়ে রাখতেন। নিজেদের বন্ধু সম্বোধন করতেন। সময়টা পঞ্চম জাতীয় সংসদের। নব্বইয়ের দশকের গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর মিজানুর রহমান চৌধুরী, মওদুদ আহমদ, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বিজয়ী হন এরশাদের ছেড়ে দেওয়া রংপুরের শূন্য আসন থেকে। সেই সময় সংসদ যারা জমিয়ে রাখতেন, প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ তাদের একজন।
তিনি বলেন, তখন একজন রিপোর্টার হিসেবে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা তার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। প্রয়াত রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমদ বক্তৃতায় অনেক কথা বলতেন, তবে লিখতেন সত্য কথা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের পোস্টমাস্টার জেনারেল ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ইয়াহিয়া খানের গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন মওদুদ আহমদ। বিদেশি সাংবাদিকদের সেই বৈঠকের খবর যারা তুলে ধরতেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আজ সোমবার (১৬ই মার্চ) রাতে দেওয়া এক পোস্টে নঈম নিজাম এসব কথা বলেন। তার ফেসবুক পোস্টটি এর মধ্যে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে তিনি বলেন, ষাটের দশকের শেষে মওদুদ আহমদ বিলেত থেকে পড়াশোনা শেষ করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়। তিনি আটক হন, জেলে যান। কিন্তু বের হয়ে জীবনের গতি থামাননি।
নঈম নিজাম লেখেন, মওদুদ আহমদ ভীষণ বিনয়ী ভঙ্গিতে কথা বলতেন সংসদে। তিনি বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিনে এক সন্ধ্যায় বসে আছি। রিপোর্টার মাহমুদ আজহার ছুটে এলো। বলল, “ভাই, আপনি কি অফিসে আছেন কিছুক্ষণ?” আমি বললাম, “কেন?” জবাবে বলল, “মওদুদ স্যার একটু আসতে চান।” আমি বললাম, “ফোনে ধরো।” আজহার ফোন করলেন মওদুদ আহমেদকে। আমি বললাম, “মওদুদ ভাই, আপনি কেন আসবেন? দরকার হলে আমি আসি।” তিনি বললেন, “না, আমি আসছি। আপনার বেশি সময় নেব না।”
নঈম নিজাম লেখেন, তিনি এলেন। আজহার তাকে নিচে গিয়ে রিসিভ করে আমার রুমে আনলেন। কথা শুরু হলো। তিনি বললেন, “একটি লেখা নিয়ে এসেছি। লেখাটি আমার বাড়ি নিয়ে। এই বাড়ির সঙ্গে আমার প্রতিবন্ধী অসুস্থ সন্তানের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তিনি লেখাটি আমার হাতে দিলেন। তিনি চা খেতে খেতে লেখাটি আমি দু’বার পড়লাম। বললাম, “অনেক বড় লেখা, দুই দিনে প্রকাশ করতে হবে।” তিনি বললেন, “তাই করুন। আপনি ছাড়া অন্য কেউ প্রকাশ করবে না। এখানে প্রকাশ হলে বেশি পাঠকের হাতে যাবে।”
নইম নিজাম আরো বলেন, আমি বললাম, “আপনি তো প্রবীণ নেতা। জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় ছিলেন। একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে আপনার এলাকার নেতাকে একটি ফোন দিন।” তিনি বললেন, “তোফায়েল সাহেব, আমু সাহেবকে ফোন করা যায়, বলা যায়। অন্য কেউ কি তাদের মতো বাস্তবতা বুঝবে?” আমি আর কথা বাড়ালাম না। মাহমুদ আজহার এখন লন্ডনপ্রবাসী। পুরো কথোপকথনের সময় আমাদের সামনে বসা ছিলেন।
তিনি বলেন, মওদুদ আহমদের সেই লেখা প্রকাশের পর হৈচৈ পড়ে যায়। পাল্টা লেখাও আসে। তিনি আবার জবাব দেন। আজ মওদুদ আহমেদের চিরতরে চলে যাওয়ার দিন। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে। চুপচাপ বসা, হাতে একটি লেখা, সন্তানের স্মৃতিতে ভেজা একটি বাড়ির গল্প। রাজনীতি মানুষকে কঠিন করে তোলে। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় আমি দেখেছিলাম একজন বাবাকে।
খবরটি শেয়ার করুন