ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বৈদ্যুতিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়ে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে ট্রাম্প আলোচনার কথা বললেও ইসরায়েল ইরান ও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে ট্রাম্পের আলোচনার দাবি খারিজ করেছে ইরান। গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলজুড়ে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে দেশটি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানে হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে সংঘাত ছড়িয়েছে, তা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ট্রাম্প। এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে চীনের পর ভারত ও পাকিস্তান এই যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা গত শনিবার রাতে বেঁধে দেন ট্রাম্প। নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প হরমুজ নিয়ে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
বলেছেন, ‘ঠিক এ মুহূর্ত থেকে’ পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো প্রকার ‘হুমকি ছাড়াই’ ইরানকে এ জলপথ পুরোপুরি খুলে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেবে। আর শুরু করা হবে সবচেয়ে বড়টি দিয়ে!’
তবে গত সোমবার এই অবস্থান থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত সমাধানের বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলাপ হয়েছে।’
এই পোস্টে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এই আলোচনার কারণে পাঁচ দিনের জন্য ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে সব ধরনের হামলা স্থগিত থাকবে।
তবে ইরান এই দাবি অস্বীকার করেছে। এরপর গতকাল ব্যাপক হামলা চালিয়েছে দেশটি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলার সতর্ক সাইরেন বেজে ওঠে, যার মধ্যে তেল আবিবও ছিল।
রাজধানী শহরে একটি বহুতল আবাসিক ভবনে বিশাল গর্ত সৃষ্টি হয়। ক্ষয়ক্ষতি সরাসরি আঘাতে হয়েছে, নাকি প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার নয়।
ইসরায়েলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস জানায়, তেল আবিবের একটি ভবনে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া বেসামরিক লোকজনের সন্ধান করা হচ্ছিল। আরেকটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের আশ্রয়কেন্দ্রেও বেসামরিক লোকজনকে পাওয়া গেছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবর বলা হয়েছে, তাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ইসরায়েলে গোয়েন্দা দপ্তরে হামলা চালিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কয়েক দফায় তেল আবিব, হাইফাসহ বেশ কয়েকটি শহরে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির নেগেভ অঞ্চল ও রামাত গান শহরে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
এ ছাড়া হাইফার বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহও গতকাল ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার পর ইসরায়েলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত ৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ওপরও হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। গতকাল সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার খবর পাওয়া গেছে। বাহরাইনে হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ইরাকের বাগদাদে হামলা চালিয়েছে ইরান।
এদিকে পাল্টা হামলায় গতকাল বারবার কেঁপে উঠেছে ইরান। দেশটির তেহরান ও ইসফাহানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে শিরাজ শহরেও। তেহরানে আইআরজিসির সদর দপ্তরে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েল।
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটির তাবরিজ শহরে হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ইরাকে শিয়াদের ওপর হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ১৪ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ইরানে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। দেশটির রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত তাদের ১৭টি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এ ছাড়া ৯৪ অ্যাম্বুলেন্স ও ত্রাণের গাড়ি হামলার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের ৪৯৮ স্কুলে এবং ২৮১টি মেডিকেল সেন্টারে হামলা হয়েছে। ৬২ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হামলায়।
এই যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ইরানের অন্তত দেড় হাজার মানুষ নিহত ও ১৮ হাজার আহত হওয়ার খবর পাওয়া হয়েছে। লেবাননে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৩৯ জন। আহত হয়েছে আড়াই হাজার। হামলায় ইরাকে ৬১ জন, ইসরায়েলে ১৮ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন, সিরিয়ায় ৪ জন, কুয়েতে ৬ জন, আমিরাতে ৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন