ফাইল ছবি
দেশে প্রায় ১৯ বছর আগে বহুল আলোচিত ওয়ান ইলেভেন-এর সময় প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
গতকাল সোমবার রাতে তাকে তার বারিধারার বাসা থেকে আটকের পর ঢাকার পল্টন থানায় মানবপাচারের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে উপস্থাপন করা হয় বলে জানিয়েছেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।
“তার বিরুদ্ধে ফেনীতে ছয়টি ও ঢাকায় পাঁচটি মামলার তথ্য পেয়েছি। এর মধ্যে ফেনীতে তিনটি মামলা বিচারাধীন। তিনি পলাতক থাকায় আদালত সেখানে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। অন্য মামলাগুলোরও আমরা তদন্ত করছি,” এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন তিনি।
এদিকে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আটক হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে অনেকেই ‘ওয়ান ইলেভেন’ ইস্যু সামনে এনে সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছেন।
তাদের অনেকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময়ে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে এর জন্য মাসুদ চৌধুরীকেই দায়ী করছেন।
ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এ প্রশ্নও উঠছে—এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিএনপি ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নিতে শুরু করলো কি না।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ঘটনাকেই ‘ওয়ান ইলেভেন’ বলা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ‘এক-এগারো’ বইয়ের লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই সময় যে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
“আর বিএনপি নিজেকে ওয়ান ইলেভেনের ভুক্তভোগী মনে করে। এ কারণেই অনেকে মাসুদ চৌধুরীর গ্রেপ্তারকে প্রতিশোধ হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। ফলে দেখতে হবে প্রকৃত অর্থে কী ধরনের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন—এই ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট এবং সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর হস্তক্ষেপে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি।
তখন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা থাকলেও তাকে ঘিরে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। একপর্যায়ে তিনি দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানান। এরপর আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন।
পরবর্তীতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং দায়িত্ব নেয় ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার।
ওই সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন দেয় এবং সেই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।
তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ এই পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার পাশাপাশি আরও কয়েকজন কর্মকর্তা আলোচনায় ছিলেন—মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, চৌধুরী ফজলুল বারী এবং এটিএম আমিন।
ফখরুদ্দীন সরকারের সময় গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন মাসুদ চৌধুরী। এই কমিটির সিদ্ধান্তেই শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া-সহ প্রায় সব শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০০৮ সালে তাকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করা হয়। পরে দেশে ফিরে ব্যবসায় যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
২০১৮ সালে এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মামলায় তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার কেবল একটি আইনি ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এটি একদিকে যেমন অতীতের বিতর্কিত ভূমিকার জবাবদিহিতার সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের প্রশ্নও সামনে আনছে।
সবশেষে, এই গ্রেপ্তারের প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপর—এবং এর মাধ্যমে ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর অজানা অনেক দিক সামনে আসতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন