শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** জাতিসংঘ সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী *** যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ *** স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রটির মালিকানা নিয়ে যা গন্ডগোল, তা কোর্টে নির্ধারণ হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী *** মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর: এমপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রসঙ্গে যা বলল ডিএমপি *** জাসদের কার্যালয় থেকে আ.লীগ সন্দেহে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আটক *** জাসদ কার্যালয় থেকে সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্য আটক *** মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের গেটে ত্রিপল টানিয়ে চলছে টিকাদান, ভোগান্তিতে শিশু-মায়েরা *** স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র ভাঙচুরে পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত হচ্ছে: ডিএমপি কমিশনার *** শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেন কেন, আজ দেখানো হবে টেলিছবিতে *** শেখ হাসিনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ-ভারত মিলে নেবে—আশা যুক্তরাষ্ট্রের

শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানের উপস্থাপক কে এই অরিন?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৭:২৮ অপরাহ্ন, ৯ই আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

৫ আগস্ট। দেশের রাজনীতিতে দিনটি দুই বছর আগে যে পরিবর্তনের সূচনা করেছিল, তার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে ভারতের নয়াদিল্লি থেকে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলেন সাতক্ষীরার এক তরুণ—আবু ওবায়দা অরিন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন অরিন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে—কে এই তরুণ? 

কীভাবে তিনি শেখ হাসিনার এত কাছাকাছি গেলেন? মাত্র দুই বছর আগেও যার পরিচয় ছিল ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে, তিনি কীভাবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন?

সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে অরিনের বিষয়ে পাওয়া তথ্য বলছে, সাতক্ষীরার একটি সাধারণ ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হলেও তার পারিবারিক পরিমণ্ডলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার যোগ রয়েছে। দেশে থাকাকালে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল বলে স্থানীয়ভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে দেশটিতে অধ্যয়নরত অরিনের রাজনৈতিক যোগাযোগের পরিধি দ্রুত বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যুক্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন হিসেবে প্রকাশ্যে আসেন।

অরিনের এই উত্থানের সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটে গত ৫ আগস্ট। নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন। এটি ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার প্রথম বড় ধরনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক উপস্থিতি। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক কূটনীতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমিনুল হক পলাশসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। অরিন ছিলেন মঞ্চে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন।

এর আগেই অবশ্য অনুষ্ঠানটি নিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। তারেক রহমান সরকার দিল্লিকে অনুরোধ করেছিল, শেখ হাসিনা যেন ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না পান। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দেশের গণমাধ্যমকেও শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার বা প্রকাশ না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার পক্ষ থেকে এমন উদ্বেগ জানানোর পরও অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য অনুষ্ঠানটির দায় নেয়নি। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছিলেন, এটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং ভারত সরকারের এতে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অনুষ্ঠানে যেসব মতামত দেওয়া হবে, সেগুলোরও ভারত সরকার সমর্থক নয় বলে স্পষ্ট করা হয়।

কিন্তু ঢাকার ক্ষোভ তাতে কমেনি। ৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আগেই ভারতের কাছে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। তারপরও শেখ হাসিনার অনুষ্ঠান হওয়াকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননাকর বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনা ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও পরবর্তী সময়ে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েনের কারণ হিসেবে উঠে আসে।

এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই অরিনের ভূমিকা বিশেষভাবে নজরে আসে। অনুষ্ঠান শুরুর আগে তিনিই রয়টার্সকে বলেছিলেন, অনুষ্ঠানটি হবে এবং ঢাকার আপত্তিতে তা বন্ধ হবে না। রয়টার্সের প্রতিবেদনে অরিনকে শেখ হাসিনার সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশের বাইরে ভিন্নমত প্রকাশের পথ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

অরিনের প্রকাশ্য পরিচয় অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে তার নাম এসেছিল। তখন তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতক প্রকৌশল পড়ছিলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তার পরিবারের ব্যবসায়ও প্রভাব পড়েছিল বলে তখন তিনি ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার বাবা একটি ছাপাখানা চালান এবং দেশের পরিস্থিতির কারণে সেটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

অর্থাৎ, ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে অরিনের পরিচয় ছিল মূলত সাতক্ষীরা থেকে আসা বাংলাদেশি এক শিক্ষার্থী হিসেবে। দুই বছর পর একই তরুণকে দেখা গেল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের অন্যতম মুখ হিসেবে। এই পরিবর্তনের সময়কালই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে।

অরিনের প্রকাশ্য শিক্ষাগত পরিচয়ও তার দ্রুত উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তার পেশাগত পরিচিতির পাতায় দেখা যায়, তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস্টার ইনোভেশন সেন্টারে তথ্যপ্রযুক্তি ও গাণিতিক উদ্ভাবন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মাদ্রাজে তথ্যবিজ্ঞান ও উপাত্তবিজ্ঞানে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনার কথাও তার গবেষণাভিত্তিক পরিচিতিতে উল্লেখ আছে।

এখন তিনি শুধু শিক্ষার্থী নন; লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবেও নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন। বিভিন্ন ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডিফেন্স অ্যাফেয়ার্স নিউজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একাধিক লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে তিনি লিখেছেন।

তার লেখার রাজনৈতিক অবস্থানও বেশ স্পষ্ট। জুনে প্রকাশিত একটি লেখায় আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন তিনি। সেখানে আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। আরেকটি লেখায় শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পেছনে বিদেশি প্রভাব যুক্ত করার দাবি করা হয়েছে। এসব লেখার কারণে অরিনকে আওয়ামী লীগপন্থী রাজনৈতিক ভাষ্যের একজন সক্রিয় তরুণ লেখক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় থেকে। দ্য ডিসেন্ট-এর একটি অনুসন্ধানে অরিনের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পরিচিতিতে তাকে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারকে ধারণকারী এবং আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা যায়। একই অনুসন্ধানে তার ভারতভিত্তিক অবস্থান এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অরিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার আরও একটি দিক হলো, তিনি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগপন্থী বক্তব্য দেননি; বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নীতিগত লেখায়ও একই অবস্থান তুলে ধরেছেন। ফলে ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতিকে কেবল এক শিক্ষার্থীর আকস্মিক সুযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং গত দুই বছরে তিনি যে রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন, সেটিই তাকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা।

সাতক্ষীরায় অবশ্য অরিনকে নিয়ে গল্পটি আরও ব্যক্তিগত। শহরের সদর থানার পাশে মুনজিতপুর লিচুতলা এলাকায় তাদের বাড়ি। বাবা আবু সোয়েব এবেল স্থানীয়ভাবে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, অরিনের রাজনীতিতে এতটা জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তারা জানতেন না। গণমাধ্যমে ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানের ছবি প্রকাশের পরই তারা তাকে নতুনভাবে চিনতে পারেন।

অরিনের বাবা আবু সোয়েব এবেল মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, তার ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে তিনি জানতেন না। গণমাধ্যমে ছবি দেখেই তিনি বুঝতে পারেন, অরিন শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ছেলের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ নেই; অরিন সাধারণত মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

মা জেবুন্নেছার বক্তব্য আরও আবেগঘন। তার ভাষ্য, পড়াশোনার জন্যই ছেলেকে দিল্লিতে পাঠিয়েছিলেন। রাজনীতিতে না জড়াতে তাকে বারবার অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্ট অনলাইনে ছেলের ছবি দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। পরে ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তার কান্নার শব্দ শুনে অরিন তাকে শান্ত থাকতে বলেন এবং ফোন কেটে দেন।

সাতক্ষীরার স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও অরিনের এই পরিচয় ছিল অপ্রত্যাশিত। প্রতিবেশীদের কেউ কেউ তাকে একজন সাধারণ তরুণ হিসেবেই চিনতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি এলাকায় আর নিয়মিত আসেননি বলেও স্থানীয়দের ভাষ্য। ফলে নয়াদিল্লির অনুষ্ঠানের ছবিতে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পাশে তাকে দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেকে।

তবে অরিনের পরিবারের রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি একেবারে শূন্য নয়। তার মামি লায়লা পারভীন সেজুতি শেখ হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আছেন। আবার অরিনের খালু অ্যাডভোকেট সৈয়দ ইফতেখার আলী সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়ক। অর্থাৎ পারিবারিক পরিমণ্ডলে দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারারই যোগাযোগ রয়েছে। তবে এই আত্মীয়তার কারণে অরিনের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ মহলেও অবশ্য আরেকটি আলোচনা রয়েছে। সাতক্ষীরা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির সঙ্গে অরিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। তবে এ সম্পর্কের প্রকৃতি বা তা অরিনকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাতে কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সুখবর ডটকম।

অরিনের নিজের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড অবশ্য তার রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়। ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে তিনি জুলাই আন্দোলনকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কেও কটূক্তিমূলক বক্তব্য দেন বলে অনুষ্ঠানটির ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অংশ থেকে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথাও বলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।

এখানেই অরিনের ভূমিকা শুধু সঞ্চালকের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তিনি অনুষ্ঠানের পরিচালনাকারী তরুণ থেকে রাজনৈতিক বার্তার বাহক হয়ে ওঠেন। তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের অবস্থান, বর্তমান সরকারের সমালোচনা এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা—সবই উঠে আসে। ফলে ৫ আগস্টের পর দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক মনস্ক বাঙালির কাছে তার পরিচয় নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

অরিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতিও তার পরিচিতির তুলনায় ছোট। আজ রোববার, ৯ আগস্ট সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬ হাজার ২০০ অনুসারী দেখা যায়। এত অল্প অনুসারীর একজন তরুণ কীভাবে কয়েক দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার সহযোগী হিসেবে পরিচিত হলেন, সেটিই এখন কৌতূহলের বড় জায়গা।

তবে তার পরিচিতি যে ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানেই তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি ঠিক নয়। এর আগে থেকেই তিনি রাজনৈতিক লেখালেখি করছিলেন। অস্ট্রেলিয়া টুডেতে মে মাসে প্রকাশিত একটি লেখায় তাকে বাংলাদেশের রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা ও ডিজিটাল সমাজ নিয়ে লেখেন—এমন একজন চিন্তক ও লেখক হিসেবে পরিচয় করানো হয়। ওই লেখায় বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আওয়ামী লীগপন্থী অবস্থান স্পষ্ট ছিল।

এমনকি ২০২৬ সালের জুলাইয়েও তার নামে বিভিন্ন নীতিগত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব লেখার বিষয়বস্তু থেকে বোঝা যায়, অরিন গত দুই বছরে একজন শিক্ষার্থী থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক ভাষ্যকারে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই পথেই তার যোগাযোগ তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে। তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ঠিক কখন, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে তৈরি হয়—এ প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো প্রকাশ্যে নেই।

সাতক্ষীরার পুলিশও বিষয়টি নতুন করে খতিয়ে দেখছে। পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অরিন সম্পর্কে তারা আগে থেকে অবগত ছিলেন না। তার পারিবারিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক পটভূমি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে এবং প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অরিনের গল্প তাই শুধু একজন তরুণের রাজনৈতিক উত্থানেরনয়। এটি একই সঙ্গে দেশের ক্ষমতার পালাবদলের পর ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরির ইঙ্গিতও দিচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে দিল্লিতে গিয়ে যে তরুণ নিজেকে শিক্ষার্থী হিসেবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে পরিচয় দিয়েছিলেন, দুই বছরের মধ্যে তিনিই হয়ে উঠেছেন শেখ হাসিনার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের দৃশ্যমান মুখ।

আর এই উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনো উত্তরহীন—দিল্লিতে পড়তে যাওয়া সাতক্ষীরার এক তরুণের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ কীভাবে তৈরি হলো? কে তাকে প্রথম শেখ হাসিনার কাছে নিয়ে গেলেন? তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে কারা কাজ করছেন? ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানটি কি ছিল তার জন্য কেবল একটি সুযোগ, নাকি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া একটি রাজনৈতিক যাত্রার প্রকাশ্য আত্মপ্রকাশ?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো অরিনের আগামী দিনের কর্মকাণ্ডেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই পরিষ্কার—৫ আগস্টের আগে যে অরিন ছিলেন সীমিত পরিসরের একজন শিক্ষার্থী ও লেখক, ৫ আগস্টের পর তিনি দেশের রাজনীতির আলোচিত এক তরুণ মুখ। তার পরিচয় এখন শুধু সাতক্ষীরার মুনজিতপুরের ছেলে হিসেবে নয়; দিল্লিতে বসে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বার্তা বহনকারী নতুন প্রজন্মের একজন হিসেবেও তাকে দেখা হচ্ছে।

আবু ওবায়দা অরিন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

জাতিসংঘ সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৬:২১ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুলিশ পরিচয়ে ছেলের কণ্ঠ নকল, বাবার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে গ্রেপ্তার ২

🕒 প্রকাশ: ০৬:১৪ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ

🕒 প্রকাশ: ০৬:০৫ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রটির মালিকানা নিয়ে যা গন্ডগোল, তা কোর্টে নির্ধারণ হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৫:৫৬ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর: এমপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রসঙ্গে যা বলল ডিএমপি

🕒 প্রকাশ: ০৫:৫১ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250