ছবি: সংগৃহীত
ঢাকায় বসে মুঠোফোনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) একাধিক শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পাসের প্যারিস রোডে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত কয়েক ব্যক্তির ছবি-সংবলিত একটি বিলবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামের ওই বিলবোর্ডটি টাঙিয়েছে ‘নোভোকালচার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান, যার পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার।
বিলবোর্ডে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে বিভিন্ন মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং সেই দণ্ড কার্যকর করা হয়।
বিলবোর্ডটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থী এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি এভাবে উপস্থাপন করলে তা বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ভুল বার্তা যেতে পারে। অন্যদিকে, বিলবোর্ডটির উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন নয়; বরং বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল কি না, সে বিতর্ক সামনে আনা।
মুঠোফোনে কথা হলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, যে-ই এই উদ্যোগ নিয়ে থাকুক না কেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশের কোথাও যুদ্ধাপরাধীদের কোনো ধরনের স্বাভাবিকীকরণ গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষ্য, যুদ্ধাপরাধ দেশের অন্যতম মৌলিক জাতীয় প্রশ্ন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন বা শেখ হাসিনার শাসনের সমালোচনাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধী মতাদর্শ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা উচিত নয়।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রঅধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা দেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য নির্যাতিত মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হওয়া দেশে এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মারুফ আরও বলেন, নোভোকালচারের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রাকসুর সাধারণ সম্পাদকের সম্পৃক্ততা থাকায় এখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠুও এ ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যাটফর্ম কোনো দলীয় বা বিতর্কিত রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। তার মতে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে অতীতের এমন একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যু যুক্ত করার যৌক্তিকতা নেই। এতে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, রাকসুর সহসভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ জানিয়েছেন, বিলবোর্ডটির সঙ্গে রাকসুর কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই। মুঠোফোনে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে আগে কেউ আলোচনা করেননি। তার ধারণা, বিলবোর্ডে বিচারবহির্ভূত বা বিতর্কিত বিচারপ্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এতে রাকসুর কোনো অর্থায়ন বা প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ছিল না বলেও তিনি দাবি করেন।
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা রাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও নোভোকালচারের পরিচালক সালাহউদ্দিন আম্মার অবশ্য সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, তাদের বিলবোর্ডের মূল বিষয় ছিল ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ বা রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্ন। তার দাবি, শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, আয়নাঘর, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।
আম্মারের ভাষ্য, বিলবোর্ডে যাদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করা বা তাদের দায়মুক্তি দেওয়াই উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল কি না, সেই বিতর্ক আলোচনায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে অবগত ছিলেন না। তবে অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন পোস্টে কেউ বিলবোর্ডটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখলেও, অনেকে এটিকে ইতিহাসের সংবেদনশীল অধ্যায় নিয়ে বিতর্কিত উপস্থাপনা বলে মন্তব্য করেছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফ হোসেন লিখেছেন, "যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে যে যার মত প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এমন উপস্থাপনা আরও সতর্কতার সঙ্গে করা উচিত।" আরেক ব্যবহারকারী নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, "মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ, তবে এমন কোনো উপস্থাপনা যেন যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসকে খাটো করছে—এমন ধারণা সৃষ্টি না হয়।"
অন্যদিকে সাদমান কবির নামে এক নেটিজেন লিখেছেন, "কোনো বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা আর অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন—দুটি বিষয় এক নয়। এ নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।" রাকিবুল ইসলাম নামে একজন মন্তব্য করেন, "বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার জায়গা। সেখানে ইতিহাসের স্পর্শকাতর বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।"
বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা—এই তিনটি বিষয়ই বাংলাদেশের জনপরিসরে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে এ ধরনের উপস্থাপনা সহজেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দেয়। সেই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্তে বিলবোর্ডটি কীভাবে, কার অনুমতিতে এবং কোন নীতিমালার আওতায় স্থাপন করা হয়েছে, সে বিষয়টি স্পষ্ট হলে বিতর্কের অনেকটাই নিরসন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খবরটি শেয়ার করুন