শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘আসিফ মাহমুদের দুর্নীতি ও লুটপাটের গডফাদার ড. ইউনূস’ *** শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই সরকারের ওপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করতে চায় আওয়ামী লীগ *** খুলনায় ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা *** মুঠোফোনের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা: পুলিশ *** পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত বেড়ে ৩১, ইত্তেহাদুল মুজাহিদিনের দায় স্বীকার *** রাজধানীতে মসজিদ থেকে আটক ২৩ জনের ১১ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ *** কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধার *** ‘তৃণমূলের নাম–প্রতীক কেড়ে নেওয়া বিজেপির নোংরা খেলা’, আদালতে মমতা *** সব জেলা পরিষদের স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক করতে সরকারের নির্দেশ *** বিধ্বস্ত পরমাণু স্থাপনা ফের নির্মাণ করছে ইরান

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই সরকারের ওপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করতে চায় আওয়ামী লীগ

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৬:৫৩ অপরাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা সামনে রেখে ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। দলটির একাধিক নেতার বক্তব্য ও গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে কর্মসূচির ঘোষণায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি অংশের দাবি, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগে আন্দোলনকে ধীরে ধীরে জোরদার করে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো হবে। এর অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

গতকাল শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ভারতের দিল্লিতে। দলটির প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, বৈঠকটি অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে সভাপতিত্ব করেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। এতে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। তবে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, দিল্লিতে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন। দিল্লির একটি ভবনে শুক্রবার রাতে ২১ কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে শেখ হাসিনার সরাসরি বৈঠকের দাবি করেছে কয়েকটি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম। ফলে বৈঠকের ধরন নিয়ে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ৮৩টি জেলা শাখা এবং ১৬০টি নির্বাচনী এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য নিয়েছেন। এসব আলোচনার ভিত্তিতে তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন খাতে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং জনগণের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বৈঠকে দলটির নেতারা দ্রব্যমূল্য কমানো, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

দলীয় সূত্রের দাবি, এসব দাবির পাশাপাশি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগে মাঠের রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দলের ভেতরের একটি অংশ মনে করছে, সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া গেলে আওয়ামী লীগ আবারও রাজপথে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারবে। তবে এ ধরনের রাজনৈতিক হিসাব আওয়ামী লীগের দলীয় বিবৃতিতে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। এর আগে জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা বলেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার বা এমনকি হত্যা করা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও তিনি ফিরতে চান।  আল জাজিরাও আগস্টে তার ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানিয়েছিল, সুনির্দিষ্ট তারিখ পরে জানানো হবে।

এই প্রত্যাবর্তনের সময়কে সামনে রেখেই আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর খবর আসছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দল পুনর্গঠন, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি কী হবে—এসব বিষয় আলোচনায় থাকার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলে দলের নেতৃত্ব কে সামলাবেন, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। এর আগে শেখ হাসিনা নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিম দলীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে আগামীকাল ২০ সেপ্টেম্বরের ‘ঢাকা লকডাউন’। দলটির সহযোগী সংগঠন যুবলীগ প্রথমে কর্মসূচিটির ঘোষণা দেয়। পরে আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন সূত্র ও প্রচারে দলীয় নেতা-কর্মীদের কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনীতি এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে আদালতের রায়ের প্রতিবাদকে সামনে রেখে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্রের দাবি, ২০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর পর জেলা পর্যায়ে এবং পরে জাতীয় পর্যায়ে আরও কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঠে সক্রিয় করা এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো। তবে সরকারকে ‘অচল’ বা ‘অথর্ব’ করে দেওয়াই আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত—এমন বক্তব্য আওয়ামী লীগের প্রকাশিত ১৮ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে নেই। ফলে এ অংশটি আপাতত দলীয় নেতাদের বক্তব্য ও সূত্রের দাবির পর্যায়েই রয়েছে।

দলটির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। আওয়ামী লীগ এসব সমস্যার জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করেছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও দলের অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ও প্রত্যাখ্যান করেছে দলটি।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান জানানো হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, শেখ হাসিনা চাইলে দেশে ফিরে আসতে পারেন এবং তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

ফলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ ও সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে। আওয়ামী লীগ চাইছে, দেশে ফেরার আগে সংগঠনকে সক্রিয় করে রাজনৈতিক উপস্থিতি দৃশ্যমান করতে। সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিষিদ্ধ দলের কর্মসূচি মোকাবিলার পাশাপাশি রাজধানী ও দেশের অন্যান্য এলাকায় জনজীবন স্বাভাবিক রাখা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির বাস্তব প্রভাব এবং এরপর আওয়ামী লীগ কী ধরনের কর্মসূচি দেয়। প্রথম কর্মসূচির পর দলটি যদি ধারাবাহিকভাবে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি দেয়, তাহলে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তবে এসব কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কতটা হবে এবং সরকারের ওপর তা কতটা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের গতকালের বৈঠক, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নতুন কর্মসূচির ঘোষণায় ধারণা করা যাচ্ছে, তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের আগে দলটি রাজনৈতিকভাবে নিজেদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। তবে সেই তৎপরতা শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত আন্দোলনে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে মাঠের কর্মসূচি, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।

শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250