ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগের সঙ্গে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িয়েছেন রাজনীতিবিদ ও সাবেক ছাত্রনেতা মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর। সম্প্রতি বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে তিনি দাবি করেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দুর্নীতি ও লুটপাটের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ড. ইউনূস।
তিনি বলেন, ‘আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া যদি ১২-১৩ হাজার বা ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার করে থাকেন, তাহলে এই চোরের পৃষ্ঠপোষক কে? তার যাবতীয় দুর্নীতি ও লুটপাটের গডফাদার হচ্ছেন ড. ইউনূস।’
তবে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের যে অভিযোগের বিষয়ে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান করছে, তার অঙ্ক ১১ হাজার কোটি টাকা। ১৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন জানায়, সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের নতুন অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে অর্থ পাচারের কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, অভিযোগ অনুযায়ী সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে বিলাসবহুল সম্পদ কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগের মধ্যে আবদুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আবদুল লতিফ খানকে ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা নিয়োগেও মোট ১৮৭ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন। পরে নতুন অভিযোগগুলো ওই অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার কথা জানানো হয়।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়, হেলিকপ্টারে ভ্রমণ, পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়টি রয়েছে। আসিফ মাহমুদ নিজে দুর্নীতি দমন কমিশনের চলমান কার্যক্রমকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রতিশোধের প্রক্রিয়া বলে দাবি করেছেন।
মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর তার বক্তব্যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়েও অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ওই মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ছিলেন হাসান আরিফ। তার দাবি, হাসান আরিফ এর আগের সরকারেও উপদেষ্টা ছিলেন এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তার নামে আর্থিক দুর্নীতির কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন মোশাররফ।
মোশাররফ আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসান আরিফকে ওই মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে সেখানে দায়িত্ব দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর হাসান আরিফ হাইকোর্টে গেলে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাকে কেন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। তখন হাসান আরিফ নাকি বলেছিলেন, তার এক হাজার কোটি টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই।
মোশাররফের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ছেলেপেলেদের দলের জন্য এক হাজার কোটি টাকা দিতে বলেছে ড. ইউনূস। আমি তো পারব না।’ তার দাবি, এরপর হাসান আরিফকে সরিয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, আসিফ মাহমুদ দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিবকে পরিবর্তন করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন দায়িত্ব পাওয়া ওই কর্মকর্তাকে ৩০০ কোটি টাকা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ১৫০ কোটি টাকা দেন। পরে বাকি অর্থ দিতে না পারায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন মোশাররফ।
এ প্রসঙ্গে মোশাররফ প্রশ্ন তোলেন, হাসান আরিফের জায়গায় আসিফ মাহমুদকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ড. ইউনূসের জানার বাইরে হয়েছিল কি না। ড. ইউনূসের অনুমোদন ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল কি না এবং ড. ইউনূস ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি ওই মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষমতা রাখতেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মোশাররফ আহমেদ আরও বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে বেশি লুটপাট চালিয়েছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আর আসিফ মাহমুদের পর সবচেয়ে বেশি যে লুটপাট চালিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন মাহফুজ আলম। এই দুজন যদি চোর হয়, দুই চোরের সর্দার কে? দুই চোরের সর্দার হচ্ছেন ড. ইউনূস। আমি আবার বলছি, আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমের সর্দার হচ্ছেন ড. ইউনূস।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ড. ইউনূসের ‘প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে’ বাংলাদেশে ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে।
মোশাররফ আহমেদ আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমের মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব এবং তাদের দুই ব্যক্তিগত সহকারীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে ড. ইউনূসকেও আইনের আওতায় আনার দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ড. ইউনূসের যারা ‘মুরব্বি’ ছিলেন এবং তাকে যারা ‘প্রমোট’ করতেন, আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির মালিক ও প্রভুদের সঙ্গে আলোচনা করে ড. ইউনূসকে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি দমন কমিশনে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালে গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন করে দুর্নীতি দমন কমিশন। এ মামলায় অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকে থাকাকালে ড. ইউনূস তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান প্যাকেজেস করপোরেশন লিমিটেডকে বেআইনিভাবে সাড়ে ৯ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন—এমন অভিযোগও দুর্নীতি দমন কমিশনে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই ঋণ ও সুদ মওকুফ করা হয়েছিল এবং উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই গ্রামীণ ব্যাংকের মুদ্রণসামগ্রী ছাপার কার্যাদেশ ওই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল। এসব অভিযোগ গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে।
তবে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের আগের একটি মামলা ২০২৫ সালের এপ্রিলে সর্বোচ্চ আদালতে বাতিল হয়। ফলে অভিযোগ, মামলা, অভিযোগপত্র ও আদালতের সিদ্ধান্ত—এসব বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনার মধ্যে রয়েছে।
২০২৬ সালেও ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা পড়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কর্মকাণ্ডের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবিতে হাইকোর্টে রিট আবেদনও করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের এপ্রিলে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে টিকা ও সিরিঞ্জ কেনায় অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করার খবরও প্রকাশিত হয়।
আসিফ মাহমুদ ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস—দুজনের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। তবে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান চলছে এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ এখনো অনুসন্ধানাধীন। অন্যদিকে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর কিছুতে মামলা ও অভিযোগপত্র হয়েছে, আবার কিছু অভিযোগ এখনো অভিযোগ বা আবেদনের পর্যায়ে রয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন