ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে রহস্য তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে এবার যুক্ত হলো নতুন একটি দাবি। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় তার বাবা ও ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। একই হামলায় মোজতবা খামেনিও আহত হন বলে বিভিন্ন সময় ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে নতুন করে সামনে আসা এক বক্তব্যে বলা হয়েছে, আহত মোজতবাকে হাসপাতালে নেওয়ার পরও তেহরানের তিনটি হাসপাতালে হামলা চালানো হয়েছিল। এর মধ্যে তৃতীয় হাসপাতালটির ধ্বংসস্তূপ থেকে মোজতবাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস বা বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহসেন হায়দারি কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল আরাবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ দাবি করেছেন। তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক পোস্ট প্রথম এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরে এনডিটিভি, গালফ নিউজ, দ্য উইক, মানিকন্ট্রোলসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিষয়টি প্রকাশ করে।
তবে হাসপাতালের ধ্বংসস্তূপ থেকে মোজতবাকে উদ্ধারের এই দাবিটি এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে নয়, একজন ইরানি ধর্মীয় নেতার বক্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হায়দারির বর্ণনা অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় আহত হওয়ার পর মোজতবাকে চিকিৎসার জন্য তেহরানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর একের পর এক তিনটি হাসপাতাল হামলার শিকার হয়। মোজতবা ছিলেন তৃতীয় হাসপাতালটিতে। হামলার পর ভবনের একটি অংশ ধসে পড়লে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাকে বের করে আনা হয়। এরপর তাকে অজ্ঞাত একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে ওই বক্তব্যে বলা হয়েছে।
ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মোজতবার আহত হওয়ার বিষয়ে ইরানের সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে নতুন এই দাবির কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কারমানপুর এর আগে জানিয়েছিলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে মোজতবা হাসপাতালে পৌঁছান এবং আহত কয়েকজনের সঙ্গে তাকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হয়। তার মুখ, মাথা ও পায়ে উপরিতলের আঘাত ছিল এবং গুরুতর কোনো জটিলতা হয়নি বলে কারমানপুর দাবি করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ রাতের দিকে মোজতবাকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে হাসপাতালগুলোতে হামলার ঘটনা যে যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতেই ঘটেছিল, তার স্বাধীন প্রমাণ রয়েছে। রয়টার্স ২ মার্চ জানিয়েছিল, তেহরানের গান্ধী হাসপাতাল আশপাশের বিস্ফোরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর খালি করতে হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তখন ওই হাসপাতালের ক্ষয়ক্ষতি এবং তেহরানের মোতাহারি হাসপাতালসহ আরও কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য যাচাই করছিল। তবে কোনো নির্দিষ্ট হামলার জন্য কে দায়ী, তা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
এই হামলার কয়েক দিন পরই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে ঘটে আরেকটি নাটকীয় পরিবর্তন। ৮ মার্চ বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলী খামেনির মৃত্যুর মাত্র আট দিনের মাথায় ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ এই সিদ্ধান্ত নেয়।
মোজতবার নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়েও হায়দারি নতুন কিছু তথ্য দিয়েছেন। তার দাবি, কুম শহরে বিশেষজ্ঞ পরিষদের কার্যালয়েও হামলা হয়েছিল। এতে আটজন নিহত এবং নতুন নেতা নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নথি ধ্বংস হয়। এরপর সদস্যরা নিরাপদ স্থানে গিয়ে কাগজের ব্যালটে ভোট দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভোট দেওয়া ৫৯ সদস্যের মধ্যে মোজতবা ৫০টি ভোট পান। আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি পান আট ভোট এবং একজন ভোটদানে বিরত থাকেন।
তবে ভোটের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ইরান ইন্টারন্যাশনাল ৯ মার্চ হায়দারির বক্তব্যের বরাত দিয়ে জানায়, বৈঠকে ৫৯ জনের মতো সদস্য উপস্থিত ছিলেন এবং মোজতবা প্রায় ৮৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদের সিদ্ধান্ত বৈধ হওয়ার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বলা হয়, মোজতবাকে বেছে নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ পরিষদের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি না করাই ছিল এর অন্যতম কারণ। আল জাজিরার বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার পদ শূন্য হলে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং এরপর বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন নেতা নির্বাচন করে। অর্থাৎ আলী খামেনির মৃত্যুর পর রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
মোজতবার নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। তিনি এর আগে কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। তবে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষমতার অন্দরমহলে তার প্রভাব এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। রয়টার্স বলেছে, মোজতবার উত্থানে রেভল্যুশনারি গার্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আল জাজিরাও জানিয়েছে, নতুন নেতা নির্বাচনের পর ওই বাহিনী প্রকাশ্যে মোজতবার প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেয়।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বিশ্লেষণেও মোজতবার নির্বাচনের মধ্যে ইরানের প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোর ধারাবাহিকতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে একই সঙ্গে তার বাবা থেকে ছেলের হাতে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যাওয়ায় বংশগত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও সামনে এসেছে। ইরানের ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে ধর্মীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাই ছিল অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে একই পরিবারের দুই সদস্যের হাতে পরপর সর্বোচ্চ পদ যাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
এদিকে মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে শুরু থেকেই নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মার্চে তাকে জীবিত কিন্তু আহত বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার গুরুতর আহত হওয়ার কথা বলেন। ট্রাম্পের দাবি ছিল, মোজতবার শরীরের বাঁ পাশ, হাত ও পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের স্বাধীন চিকিৎসাগত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। ফলে তার প্রকৃত শারীরিক অবস্থা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
মোজতবা ৮ মার্চ সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর এখনো প্রকাশ্যে আসেননি। তার পক্ষ থেকে লিখিত বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সরাসরি জনসমক্ষে উপস্থিতি দেখা যায়নি। এ কারণে তার অবস্থান ও স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা অব্যাহত রয়েছে। আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার এবিসি নিউজও লিখেছিল, মোজতবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই প্রতিবেদনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বক্তব্যের উল্লেখ করে বলা হয়, তিনি মোজতবাকে দেখেননি।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মে মাসে দাবি করেছিলেন, তিনি মোজতবার সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সরাসরি বৈঠক করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকটি ছিল আন্তরিক ও খোলামেলা। পরে ইরান ইন্টারন্যাশনাল ওই বৈঠক নিয়ে ভিন্ন একটি সূত্রের দাবি প্রকাশ করে। ফলে বৈঠকের বিস্তারিত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ইরানবিষয়ক বিশ্লেষকদের কাছে মোজতবার দীর্ঘ অনুপস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো কীভাবে তার অনুপস্থিতিতে কাজ করছে। আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলা স্টিমসন সেন্টারের বিশিষ্ট ফেলো বারবারা স্লাভিন বলেছিলেন, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের বিভিন্ন স্তরের নেতারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অর্থাৎ সর্বোচ্চ নেতার প্রকাশ্য উপস্থিতি না থাকলেও রাষ্ট্রের ক্ষমতার অন্যান্য কেন্দ্রগুলো সক্রিয় রয়েছে।
রয়টার্সও এক বিশ্লেষণে বলেছিল, আলী খামেনি ও রেভল্যুশনারি গার্ডের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যুর পরও ইরানের জটিল রাষ্ট্রীয় কাঠামো সচল রয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিলেও তার প্রকাশ্য অনুপস্থিতি তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে মোজতবা খামেনিকে ঘিরে এখন তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচনায়—২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তার প্রকৃত আঘাতের মাত্রা, হাসপাতালে দ্বিতীয় দফার হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে তাকে উদ্ধারের দাবি এবং ৮ মার্চ তাকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া। প্রথম দুটি বিষয়ে ইরানের বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য পুরোপুরি মেলে না। আর তৃতীয় বিষয়ে তার নির্বাচিত হওয়া নিশ্চিত হলেও ভোটের বিস্তারিত নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে পার্থক্য রয়েছে।
তাই ধ্বংসস্তূপ থেকে মোজতবা খামেনির বেঁচে ফেরার কাহিনি এখন পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া দাবি। তবে এটুকু স্পষ্ট যে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ওপর নজিরবিহীন আঘাত হেনেছিল এবং মাত্র আট দিনের মধ্যে সেই শূন্যতা পূরণ করে মোজতবা খামেনিকে দেশের সর্বোচ্চ পদে বসানো হয়। এরপর প্রায় সাত মাস ধরে তার প্রকাশ্য অনুপস্থিতি সেই সময়ের হামলা, তার স্বাস্থ্য এবং ইরানের ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে চলেছে।
খবরটি শেয়ার করুন