ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীতে তিন দিনের ব্যবধানে চারটি পৃথক ঘটনায় দখলের চেষ্টা, অস্ত্রধারীদের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কোথাও জমি ও স্থাপনা দখলের চেষ্টা, কোথাও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং কোথাও আবাসন প্রকল্পে হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তির হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। হামলাকারীরা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ভেতরে ঢুকে মালামাল লুট করে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্থাপনাটির একটি বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শনিবার তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। লুটপাটের সময় ঘটনাস্থলের বাইরে পুলিশের একটি গাড়ি ছিল। সেই সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মালামাল পিকআপে তোলার দৃশ্যও সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। লুটপাটের আগে একটি খননযন্ত্রকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যেতে দেখা যায়।
ঘটনার পর শনিবার মিরপুরে বিক্ষোভ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আয়োজনে ওই বিক্ষোভ থেকে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করা হয়। জামায়াতের আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এরপর গতকাল শনিবার সকালে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় ৩৫ কাঠা জমি দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয় সূত্র ও জমির মালিকপক্ষের অভিযোগ, শতাধিক লোক ওই এলাকায় গিয়ে জমির ভেতরের কার্যালয়ে হামলা চালান। সেখানে থাকা মালামাল লুট ও স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়। ঘটনাটি ঘটে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে রোজ ভিলা-সংলগ্ন এলাকায়।
জমির মালিকপক্ষের অভিযোগ, হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিরাও ছিলেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
একই শনিবার সকালে রাজধানীর আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকার একটি আটতলা বাড়িতে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল হামলা চালায় বলে বাড়ির বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, হামলাকারীদের কয়েকজনের হাতে চাপাতি, রামদা ও পিস্তল ছিল। তারা বাড়ির মূল ফটক খুলে বাসিন্দাদের বের হয়ে যেতে বলেন এবং টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাড়ির বাসিন্দাদের ভাষ্য, পরে হামলাকারীরা চাপাতি ও রামদা দিয়ে মূল ফটকে কোপাতে থাকেন। সিসিটিভি ক্যামেরা ও জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়। ইটের টুকরা ছুড়ে দ্বিতীয় তলার আরও দুটি জানালা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। বাড়ির মালিক ব্যবসায়ী আমিনুর রহমানের ভাতিজা মনির হোসেন বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে চারজন মূল ফটকের সামনে এসেছিলেন। তাদের দুজনের হাতে চাপাতি এবং একজনের হাতে রামদা ছিল। কিছুটা দূরে পিস্তল হাতে আরও একজন দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
মনির হোসেনের দাবি, হামলাকারীরা বাড়ির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। প্রায় পাঁচ মিনিট অবস্থানের পর তারা চলে যান। তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল পৌনে ১০টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পরে আদাবর থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়।
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর পুলিশ বাড়িটি পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বাড়িটির মালিকপক্ষের দাবি, এর আগেও ওই বাড়ি দখলের চেষ্টা হয়েছিল। মনির হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট খোরশেদ আলম নামে এক ব্যক্তি বাড়িটি দখল করেছিলেন। পরে থানায় অভিযোগ করা হয় এবং আদালতে মামলা করা হয়। আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বিষয়টি তদন্ত করে। গত ১২ মার্চ তারা বাড়িটির দখল ফিরে পান। প্রায় চার মাস তদন্তের পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন অভিযোগপত্রও দিয়েছে বলে তার দাবি।
শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও ছাড়াও আবাসন প্রকল্পটির কার্যালয় ও আশপাশের কয়েকটি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিউগিনি প্রপার্টিজের এক কর্মকর্তা সুখবর ডটকমকে বলেন, হামলাকারীরা পাঁচটি পিকআপে করে এসেছিলেন এবং তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তারা গুলি করতে করতে আবাসন প্রকল্পের ভেতরে ঢোকেন বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় তার পক্ষ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগও করা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর হামলা চালানো হয়। পুলিশ এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে।
তিন দিনের ব্যবধানে এসব ঘটনায় জমি, বাড়ি, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। পৃথক ঘটনায় ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অস্ত্র প্রদর্শন, দখলের চেষ্টা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ করেছেন। কয়েকটি ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্যও পাওয়া গেছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার পর শনিবার জামায়াত বিক্ষোভ করেছে। দলটির নেতারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এসব ঘটনার মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির উদ্বেগও সামনে এসেছে। সংগঠনটি সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, দখল ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। টিআইবির আগের গবেষণায়ও সরকার পতনের পর দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সংঘাতের তথ্য উঠে এসেছিল।
এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন। সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অপসারণের দাবিও তোলা হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন