ফাইল ছবি
বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা একটি সরকারের প্রথম কয়েক মাস সাধারণত কেবল প্রশাসনিক সময় নয়, রাজনৈতিক অর্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়েই জনগণ নতুন সরকারের চরিত্র, অগ্রাধিকার এবং কাজের গতি বোঝার চেষ্টা করে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়। জনগণের একাংশের চোখে এই সময় নতুন সূচনার প্রতীক, অন্য অংশের কাছে এটি প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান মাপার একটি সূচক।
ক্ষমতা গ্রহণের পর তারেক রহমান সরকার শুরু থেকেই এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যেখানে জনমানুষের প্রত্যাশা ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। বহু বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক ক্লান্তি মানুষকে দ্রুত পরিবর্তনের আশা দেখিয়েছিল। কিন্তু কোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই দীর্ঘদিনের সংকট অল্প সময়ে সমাধান করতে পারে না—এই বাস্তবতাও সমানভাবে সত্য।
প্রথম ১০০ দিনে সরকার কয়েকটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি, কৃষি ও পরিবারভিত্তিক সহায়তা প্রকল্প এবং সরকারি ব্যয়ে সংযম প্রদর্শনের মতো উদ্যোগগুলো সরকারের প্রাথমিক কর্মসূচির অংশ হয়ে ওঠে। সংসদ সদস্যদের কিছু সুবিধা ত্যাগ করার সিদ্ধান্তও রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার জনমনে এমন একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা করেছে যে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে সরকারের প্রকৃত মূল্যায়ন সাধারণত প্রতীকী উদ্যোগ দিয়ে হয় না। জনগণের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কর্মসংস্থান এবং দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা।
প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই সরকার যে তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়—দাম নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা—সেগুলোই পরবর্তীকালে সরকারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে অর্থনীতির দিক থেকে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, সেটি সহজ ছিল না। উচ্চ ঋণের বোঝা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ অর্থনীতিকে আগে থেকেই অস্থির করে রেখেছিল। ফলে সরকার নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার আগেই তাকে বিদ্যমান সংকটের ভার বহন করতে হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরিসংখ্যানগত দৃষ্টিকোণ থেকে সামান্য ওঠানামা অনেক সময় খুব বড় কিছু মনে না হলেও বাজারে এর প্রভাব দ্রুত অনুভূত হয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কয়েকটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও মাসিক ব্যয়ের হিসাব এলোমেলো করে দিতে পারে।
সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে জনগণকে দীর্ঘ সময় আশ্বস্ত রাখা যায় না। মানুষ বাজারে গিয়ে যে দামে চাল, ডাল, তেল কিংবা সবজি কিনছে, সেটাই শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি তাদের আস্থাকে প্রভাবিত করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব। আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপণ্যের দামেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক এলাকায় সরবরাহসংক্রান্ত অভিযোগ অব্যাহত থাকায় জনগণের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি তৈরি হয়নি।
এদিকে অর্থনীতির বাইরে সরকারের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। যেকোনো সরকারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্বগুলোর একটি হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু গত কয়েক মাসে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলো উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা, দ্রুত বিচার এবং প্রশাসনিক সমন্বয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, সরকারের সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো ইতিবাচক হলেও শুরুতে জননিরাপত্তার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন ছিল।
কারণ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও মানুষ অনেক সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা দ্রুত আস্থার সংকট তৈরি করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন মন্ত্রিসভা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীদের বক্তব্য এবং কর্মকৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, সরকারের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা। প্রধানমন্ত্রী কিংবা কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, নতুন সরকারগুলো সাধারণত প্রথম কয়েক মাসে দুটি বড় চাপের মুখে পড়ে। প্রথমটি হলো—নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ। দ্বিতীয়টি হলো—আগের সরকারের রেখে যাওয়া সংকট মোকাবিলার চাপ। বর্তমান সরকারও একই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যমান অনেক সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। দীর্ঘ সময়ের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ঋণ বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নতুন সরকারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য হচ্ছে, জনগণ শেষ পর্যন্ত অতীতের ব্যাখ্যার চেয়ে বর্তমানের ফলাফল দেখতে চায়। স্বাস্থ্য খাতও সরকারের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জরুরি টিকা কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শ্রমবাজার—এই তিন খাতে টেকসই নীতিমালা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ধরে রাখা কঠিন বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
প্রথম ১০০ দিন কোনো সরকারের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় নয়। এটি বরং একটি দিকনির্দেশনা। এই সময় সরকার কোন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কী ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে এবং প্রশাসনিক কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে—সেসব বিষয় স্পষ্ট হতে শুরু করে।
বিএনপি সরকারের ক্ষেত্রেও আগামী কয়েক মাস সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে। কারণ প্রাথমিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখা তুলনামূলক সহজ হলেও সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় রূপ দেওয়া অনেক কঠিন।
শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সাফল্য নির্ধারণ করে কেবল ঘোষিত কর্মসূচি নয়; বরং মানুষ তার জীবনে বাস্তব পরিবর্তন অনুভব করছে কি না—সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আগামী কয়েক মাসেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
খবরটি শেয়ার করুন