ফাইল ছবি
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে, তখনই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের আয়োজনে বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় নিউইয়র্কের কুইন্সি প্যালেসে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের অনলাইন ইভেন্ট পেজে শেখ হাসিনাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইভেন্টব্রাইটে প্রকাশিত আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিক বৈঠকের শিরোনাম ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রেস কনফারেন্স—বাংলাদেশ: সেভ দ্য কান্ট্রি, পিপল অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অনুষ্ঠানটির সময় নির্ধারণ করা হয়। স্থান হিসেবে দেওয়া হয়েছে কুইন্সের ৩৭-১১, ৫৭তম স্ট্রিটের কুইন্সি প্যালেস। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংবিধানিক অধিকার, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেবেন। এরপর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব রাখা হয়েছে।
ইভেন্ট পেজে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের স্বীকৃত সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিতি বা নিরাপদ অনলাইন সম্প্রচারের মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জন্য সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থার কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবন্ধিত সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানের পর বক্তব্যের লিখিত অনুলিপি ও তথ্যপত্র দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অনুষ্ঠানের সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় শুরু হবে শেখ হাসিনার সাংবাদিক বৈঠক। এর তিন ঘণ্টা আগে, বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হিসেবে দ্য ভয়েসের হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক ও সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীরের নাম দেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের পক্ষে নিউ ইংল্যান্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক টিপু চৌধুরী এবং যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের নামও ইভেন্ট পেজে রয়েছে।
এই সাংবাদিক বৈঠকের সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অবস্থানের মধ্যেই। তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান। তুর্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে গ্র্যান্ড হায়াত নিউইয়র্ক হোটেলে নেওয়া হয়। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ইউএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্ক সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী এই হোটেলেই অবস্থান করছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার দিকে বাংলাদেশের বক্তব্য দেওয়ার সূচি তারেক রহমানের। প্রধানমন্ত্রী বাংলা ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তার প্রথম ভাষণ।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভাষণে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পাবে। রোহিঙ্গা সংকট, নারী ও তরুণদের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তারেক রহমানের এই ভাষণের সঙ্গে শেখ হাসিনার নিউইয়র্কের সাংবাদিক বৈঠকের সময়ের ব্যবধান কয়েক ঘণ্টার। ফলে একই দিনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারপ্রধান এবং সাবেক সরকারপ্রধানের বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে আসার ঘটনা তৈরি হয়েছে। তবে শেখ হাসিনার সাংবাদিক বৈঠকটি দলীয় আয়োজনে। জাতিসংঘের কোনো অনুষ্ঠান বা জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে এটি আয়োজন করা হয়নি।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়ার পর ভারত যান। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং পরবর্তী সহিংসতার মধ্যে তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। তার ভারতে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগে বিষয়টি নিয়মিত আলোচনায় এসেছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার প্রকাশ্য বক্তব্য এবং তাকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের দাবি—এই তিনটি বিষয় ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের আলোচনায় রয়েছে। বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল আগস্টে জানিয়েছিলেন, প্রত্যর্পণের অনুরোধ ভারত প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় পর্যালোচনা করছে।
৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠকও হয়েছিল। দ্য হিন্দু জানিয়েছিল, সেটি একটি বেসরকারি উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল এবং ভারত সরকার ওই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ওই অনুষ্ঠানের আগে বাংলাদেশ এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ মে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধনও স্থগিত করে। ফলে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাকে অনুপস্থিতিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শেখ হাসিনা ওই বিচারকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তারেক রহমানের ভাষণও বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার প্রথম বক্তব্য হিসেবে সামনে আসছে। তিনি জিয়া পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিচ্ছেন। তার বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন। তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর।
বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমানের পর খালেদা জিয়া এবং এবার তারেক রহমান—এই তিনজনের মাধ্যমে একই পরিবারের তিন সদস্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। খালেদা জিয়া পরবর্তী সময়েও জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছেন।
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে শেষ হওয়ার কথা। ওই রাতে তার ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে কুইন্সি প্যালেসে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সাংবাদিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের ঘোষিত বিষয় বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাংবিধানিক অধিকার।
ইভেন্টব্রাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা সরাসরি যুক্ত হওয়ার কথা।
খবরটি শেয়ার করুন