শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘আসিফ মাহমুদের দুর্নীতি ও লুটপাটের গডফাদার ড. ইউনূস’ *** শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই সরকারের ওপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করতে চায় আওয়ামী লীগ *** খুলনায় ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা *** মুঠোফোনের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা: পুলিশ *** পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত বেড়ে ৩১, ইত্তেহাদুল মুজাহিদিনের দায় স্বীকার *** রাজধানীতে মসজিদ থেকে আটক ২৩ জনের ১১ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ *** কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধার *** ‘তৃণমূলের নাম–প্রতীক কেড়ে নেওয়া বিজেপির নোংরা খেলা’, আদালতে মমতা *** সব জেলা পরিষদের স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক করতে সরকারের নির্দেশ *** বিধ্বস্ত পরমাণু স্থাপনা ফের নির্মাণ করছে ইরান

সুখবর এক্সপ্লেইনার

দুবাইয়ে বেনজীরের মুক্তি, চারদিন পর জানল সরকার, ব্যর্থতা কোথায়?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৭:০৬ অপরাহ্ন, ২রা আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে জামিনে মুক্তি পাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং কূটনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, বেনজীরের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী তিনি গত বৃহস্পতিবার দুবাইয়ের কারাগার থেকে বের হলেও বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি প্রকাশ্যে জানতে পারে চার দিন পর, আজ রোববার (২ আগস্ট)। এরপরই শুরু হয় সরকারি তৎপরতা।

রোববার সকালে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বেনজীর আহমেদের জামিনে মুক্তির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তর, দুদক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একে একে প্রতিক্রিয়া জানান। তবে প্রথম প্রতিক্রিয়াগুলোতে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—কোনো সংস্থার কাছেই তখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক নথি বা প্রত্যয়নিত তথ্য পৌঁছায়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুবাই কর্তৃপক্ষ কিংবা ইন্টারপোলের কাছ থেকে মুক্তি-সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা তারা পায়নি। ফলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একই অবস্থানের কথা জানিয়েছে দুদকও। সংস্থাটির মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী আজ বিকেলে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, সংবাদমাধ্যম থেকেই তারা বিষয়টি জেনেছেন; তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে না আসা পর্যন্ত আইনি অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

অন্যদিকে বিকেলে রাজশাহীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সরকার ইতোমধ্যে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে এবং বেনজীর আহমেদ শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন। তিনি বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বরাষ্ট্রসচিব দুবাইয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কয়েক দিন আগে নিয়োগ দেওয়া একটি স্থানীয় আইনজীবী প্রতিষ্ঠানকে জামিন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীরকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ না করার শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছে এবং জামিনের শর্তের প্রত্যয়নিত কপি সংগ্রহের উদ্যোগ চলছে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—যদি সরকারের কাছে শেষ পর্যন্ত তথ্য পৌঁছেই থাকে, তাহলে চার দিন ধরে সেই তথ্য কেন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে ছিল না?

কূটনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো বিদেশি আদালতে জামিন মঞ্জুর হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা অভিযোগকারী রাষ্ট্রকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয় না। বিশেষ করে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত মামলায় আদালত, প্রসিকিউশন, স্থানীয় পুলিশ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস—একাধিক স্তরে যোগাযোগ সম্পন্ন হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক বার্তা পৌঁছায়। ফলে কয়েক দিনের ব্যবধান অস্বাভাবিক নয়।

কূটনীতিক ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চপ্রোফাইল কোনো পলাতক আসামির ক্ষেত্রে অভিযোগকারী রাষ্ট্রের দূতাবাসের নিয়মিত অনুসরণ (ফলো-আপ) থাকা প্রত্যাশিত। যদি বেনজীরের জামিন বৃহস্পতিবার হয়ে থাকে, তাহলে দূতাবাস বা সরকারের নিয়োজিত আইনজীবীরা কখন বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং কখন ঢাকাকে অবহিত করেছেন—এই সময়রেখা স্পষ্ট করা হলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

এ মুহূর্তে পাওয়া তথ্য থেকে দূতাবাসের ব্যর্থতা ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ সরকার নিজেই জানিয়েছে, তারা একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছিল এবং সেই প্রতিষ্ঠানকে জামিন বাতিলের আবেদন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়া চলমান ছিল। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যপ্রবাহ আরও দ্রুত ও সমন্বিত হলে সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আরও আগে আসতে পারত।

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালে তার ও পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। পরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়। আদালতের নির্দেশে তার বিপুল সম্পদ জব্দ, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং দেশ-বিদেশে আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের নির্দেশ দেন। এরপর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে বাংলাদেশ পুলিশ জানায়। জুন মাসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় ইন্টারপোলের ভূমিকা নিয়েও অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। বাস্তবে ইন্টারপোল কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটকে রাখে না। সংস্থাটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বয় করে এবং রেড নোটিশ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তার মাধ্যমে সহযোগিতা করে। গ্রেপ্তার, জামিন বা প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব আদালত ও আইন অনুযায়ী হয়।

সেই কারণে বেনজীর আহমেদের জামিন পাওয়া মানেই তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মামলা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালতে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং বাংলাদেশ কত দ্রুত প্রয়োজনীয় নথি ও আইনি যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে।

সরকার ইতোমধ্যে জামিন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে আইনি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু জামিন বাতিল করাই যথেষ্ট নয়। প্রত্যর্পণের পক্ষে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি, অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা, আদালতের চাহিদা অনুযায়ী নথি এবং দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক সমন্বয়—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ঘটনাটি আরও একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ, অর্থ পাচার বা দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেবল আদালতের আদেশ বা ইন্টারপোলের নোটিশ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান, দূতাবাসের সক্রিয় তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা।

বেনজীর আহমেদের জামিনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সরকারের প্রতিক্রিয়া সংবাদ প্রকাশের পর দৃশ্যমান হয়েছে। তবে চার দিনের ব্যবধানে তথ্যপ্রবাহ কেন বিলম্বিত হলো, দূতাবাস কখন জানতে পারল, আইনজীবী প্রতিষ্ঠান কখন অবহিত করল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন ঢাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। সেই উত্তরগুলো প্রকাশ পেলে তবেই বোঝা যাবে এটি কেবল আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক বিলম্ব ছিল, নাকি সমন্বয়ের ঘাটতিও ছিল।

বেনজীর আহমেদ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250