রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** সাবেক সেনাপ্রধান শফিউদ্দিনকে দুদকে তলব *** গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের তাগিদ *** ঢাকার মূলসড়কে চলতে দেওয়া হবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা *** গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি *** হামের উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ৯৬৭ *** সমুদ্রে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত *** ঢাকার মূল সড়কে চলবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা, নীতিমালা হচ্ছে: শাহে আলম *** মুসলিম বিশ্বের ‘প্রকৃত শত্রু’ ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করুন: মোজতবা খামেনি *** দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তায় দুর্নীতি-অপচয় ঠেকাতে সরকার-এনজিও অংশীদারত্ব জরুরি: অর্থমন্ত্রী *** ‘মেসিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার ভাষা ফুরিয়ে যাবে’

চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে হরিণ জবাই, ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তীব্র সমালোচনা

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ১২:২৫ অপরাহ্ন, ১৬ই এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একটি হরিণকে প্রকাশ্যে জবাই করার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের মুহুরী প্রকল্প এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

তবে ঘটনার তিন দিন পর গতকাল বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিওর মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি হরিণকে মাটিতে ফেলে এক ব্যক্তি তার পা চেপে ধরে রেখেছেন, আরেকজন ধারালো দা দিয়ে গলা কাটার চেষ্টা করছেন। ঘটনাস্থলে আরও একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

ভিডিও ধারণের সময় জবাইয়ে জড়িত এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানতে চান, কেন ভিডিও করা হচ্ছে। জবাবে ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি এতে সমস্যা কোথায় জানতে চাইলে সেখানে উত্তেজনার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় মিরসরাইয়ের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল সবুজ ম্যানগ্রোভ বন। সেখানে হাজার হাজার হরিণসহ নানা প্রজাতির বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ছিল।

তবে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কারণে বন উজাড় হওয়ায় বন্য প্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, জবাই করা হরিণটি দলছুট হয়ে লোকালয়ে চলে এসেছিল।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপকূলীয় বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহেনশাহ নাওশাদ আজ বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ভিডিওটি তাদের নজরে এসেছে এবং প্রাথমিক তদন্তে তিনজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা স্থানীয় খামারে কাজ করেন বলে জানা গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই এটিকে “নির্মমতা” ও “আইন লঙ্ঘন” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নেটিজেনদের একাংশ বন্য প্রাণী সংরক্ষণে প্রশাসনের ব্যর্থতার কথাও তুলে ধরেছেন।

ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহমুদ হাসান লিখেছেন, “একটা অসহায় প্রাণী লোকালয়ে চলে আসলেই কি তাকে এভাবে জবাই করতে হবে? এটা তো সরাসরি অপরাধ।” আরেকজন ব্যবহারকারী সাদিয়া রহমান মন্তব্য করেন, “বন ধ্বংস করে প্রাণীদের বাসস্থান কেড়ে নিচ্ছি, আবার তারা লোকালয়ে এলে মেরে ফেলছি—এটা কেমন মানবিকতা?”

নেটিজেন আরিফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভিডিওতে যারা আছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। না হলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে।” কেউ কেউ আবার স্থানীয়দের সচেতনতার অভাবকেও দায়ী করেছেন।

রিয়াজ আহমেদ নামের একজন লিখেছেন, “এটা শুধু আইনগত নয়, নৈতিক সমস্যাও। মানুষ বুঝতেই পারছে না বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কতটা জরুরি।” দেশে বন্য প্রাণী হত্যা বা শিকার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, হরিণসহ সংরক্ষিত প্রাণী হত্যা করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবুও বাস্তবে এমন ঘটনা নতুন নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনাঞ্চল কমে যাওয়া, মানুষের অনুপ্রবেশ এবং সচেতনতার অভাব—এই তিনটি কারণ মিলেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, মিরসরাই এলাকায় শিল্পায়নের ফলে প্রাকৃতিক বনভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপত্তার অভাবে বন্য প্রাণীরা প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আর তখনই তারা শিকার বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

বন বিভাগ সূত্র সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

একজন বন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, “লোকালয়ে বন্য প্রাণী ঢুকে পড়লে কী করতে হবে—এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেকেই ভয় বা অজ্ঞতার কারণে ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।” তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি বৃহত্তর সংকটের ইঙ্গিত। তারা বলছেন, বন উজাড় বন্ধ না হলে এবং প্রাকৃতিক বাসস্থান রক্ষা না করলে বন্য প্রাণী-মানুষ সংঘাত আরও বাড়বে।

অনেকে বলছেন, মিরসরাইয়ের এই ঘটনাটি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জরুরি প্রয়োজনীয়তা। একটি ভাইরাল ভিডিও হয়তো ক্ষণিকের আলোড়ন তোলে, কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতা অনেক গভীর। বন উজাড়, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, এবং মানুষের অসচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে মানুষ ও বন্য প্রাণীর সংঘাত দিন দিন বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় শুধু অভিযুক্তদের শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রতি বাস্তব প্রতিশ্রুতি। নইলে এই হরিণের মতো আরও অনেক প্রাণী একই পরিণতির শিকার হবে—নীরবে।

প্রকাশ্যে হরিণ জবাই

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250