ফাইল ছবি
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ফোনে কথা বলার দাবি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচারিত দাবি অনুযায়ী ব্রিকস সম্মেলনের সময় প্রায় ২০ মিনিট শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন পুতিন।
সেই সময় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে এ ফোনালাপের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ভারত, রাশিয়া কিংবা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কথোপকথনের বিষয়বস্তুও প্রকাশ্যে আসেনি।
বিষয়টি নিয়ে দেশের মানবজমিনসহ একাধিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও ঢাকা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে, সরকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। ফোনালাপের দাবির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো ঢাকার হাতে নেই বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ভারত আয়োজিত এই সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ১১ সদস্যদেশের নেতারা অংশ নেন। সম্মেলনে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, খাদ্যনিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্মেলনটি ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও এর মধ্য দিয়ে চীনের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
এই সম্মেলনের আগে-পরে পুতিনের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের দাবিটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে মূলত দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ রুশ ঋণের মাধ্যমে জোগান দেওয়ার কথা।
রূপপুর প্রকল্পের সঙ্গে পুতিন ও শেখ হাসিনার সরাসরি যোগাযোগের নজিরও রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান আসার অনুষ্ঠানে ভিডিও সংযোগে অংশ নিয়েছিলেন পুতিন ও শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স তখন জানিয়েছিল, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সঙ্গে বাংলাদেশের ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ।
২০২৬ সালের এপ্রিলেও রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা নতুন পর্যায়ে পৌঁছায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোসাটম প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করার কাজ শুরু করে। দুই ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। রাশিয়া প্রকল্পটির প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে।
ফলে ব্রিকস সম্মেলনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আয়োজনের সময় পুতিনের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের দাবি সামনে আসায় রূপপুরসহ দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ভারতের রাষ্ট্রীয় পরমাণু প্রকল্পে রাশিয়ার বড় অংশীদারত্ব এবং বাংলাদেশে রূপপুর প্রকল্পে মস্কোর বিপুল বিনিয়োগ—দুই দিক থেকেই বিষয়টির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে ফোনালাপের দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে ভারত সরকার, রাশিয়া, ক্রেমলিন কিংবা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কোনো সরকারি বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ফোনে কী আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কেও কোনো সরকারি নথি বা বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
ভারতের আরএসএস-সমর্থিত সংবাদমাধ্যম অর্গানাইজারও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে পুতিন ও শেখ হাসিনার কথোপকথনের দাবিকে রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির সম্ভাব্য যোগসূত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পের ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্গানাইজারের বিশ্লেষণে একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এবং ঢাকার সাম্প্রতিক ‘সম্পর্ক পুনর্গঠন’-এর বার্তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পুতিন-হাসিনা ফোনালাপের দাবি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত মতপার্থক্য দেখা দেয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ কারণে তিনি ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেননি এবং বাংলাদেশ কোনো সরকারি প্রতিনিধি না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনের পর বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘পুনর্গঠন’ করতে চাওয়ার কথা জানিয়েছে। হুমায়ুন কবির বলেছেন, ঢাকা ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় এবং এ সম্পর্ক বহুপক্ষীয় কোনো মঞ্চের বদলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
হিন্দুস্তান টাইমসও জানিয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের দাবি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম জটিল বিষয় হয়ে আছে। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে পুতিন-হাসিনা কথোপকথনের দাবিকে শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। শেখ হাসিনা এখন ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন। একই সময়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তার প্রত্যর্পণ চেয়ে আসছে। ফলে রাশিয়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তির রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য যোগাযোগ হলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা-দিল্লি-মস্কোর কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, তবে ফোনালাপটি সত্যিই হয়ে থাকলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নির্ধারণের আগে কথোপকথনের বিষয় জানা জরুরি। পুতিন কি শুধু ব্যক্তিগত সৌজন্য বিনিময় করেছেন, নাকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রূপপুর প্রকল্প, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ কিংবা বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এ মুহূর্তে এর কোনোটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ব্রিকস সম্মেলনে পুতিনের উপস্থিতিও ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্স জানিয়েছে, সম্মেলনের আগে নয়াদিল্লিতে পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। পুতিন ব্রিকসকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতার আরও কার্যকর মঞ্চে পরিণত করার ওপর জোর দেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিকসের ২০২৬ সালের সম্মেলনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহব্যবস্থার সংকট, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ১১ সদস্যের এই জোট এখন বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককে প্রতিনিধিত্ব করে।
এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আবহে শেখ হাসিনার সঙ্গে পুতিনের কথোপকথনের দাবি সামনে আসায় বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরেও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো দীর্ঘমেয়াদি রুশ বিনিয়োগ, ঢাকার সঙ্গে মস্কোর পুরোনো সম্পর্ক এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে পুতিনের পূর্বপরিচিতির কারণে এই যোগাযোগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
তবে আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—ফোনালাপের খবরটি এখনো দাবি পর্যায়েই রয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা ও অর্গানাইজার এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও ভারত, রাশিয়া বা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আসেনি। ঢাকাও প্রকাশ্যে কিছু বলেনি; পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত পুতিন-হাসিনা ফোনালাপকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আলোচিত একটি কূটনৈতিক দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন