ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অভিযোগে রাদ আলানবাগি নামের এক ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস—সংক্ষেপে এইচএসআই—জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তার অতীত পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর তাকে আটক করা হয়। তবে সাদ্দাম সরকারের গোয়েন্দা কাঠামোয় তার সুনির্দিষ্ট পদ, দায়িত্ব কিংবা তিনি কী ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
স্থানীয় সময় গত রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, এইচএসআইয়ের ডেট্রয়েট কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আলানবাগিকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। সংস্থাটি বলেছে, তাদের পরিচালিত তদন্তে সাদ্দাম হোসেনের আমলে ইরাকের গোয়েন্দা ব্যবস্থার সঙ্গে আলানবাগির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে মেট্রো ডেট্রয়েট এলাকার ফার্মিংটন হিলস থেকে আটক করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কুর্দিস্তান২৪ জানিয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সাবেক বিদেশি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি নিজের অতীত পরিচয় গোপন করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বা সেখানে বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের বরাতে জানা গেছে, আলানবাগি ২০১৪ সালে নিউইয়র্ক হয়ে আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় দেওয়া শর্ত লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ করেছে দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ। তবে চলমান তদন্তের কারণ দেখিয়ে বিভাগটি তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ করেনি।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আলানবাগিকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগ প্রকাশ করা হয়নি। কুর্দিস্তান২৪ জানিয়েছে, তার সঠিক পদমর্যাদা, গোয়েন্দা সংস্থায় দায়িত্ব, সাদ্দাম আমলে তার কর্মকাণ্ড, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থান এবং সম্ভাব্য অভিযোগ—কোনোটিই কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।
এ কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনাটিকে সরাসরি যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে আলানবাগি তার অতীত সম্পর্কে কী তথ্য দিয়েছিলেন। তিনি কোনো তথ্য গোপন করে থাকলে সেটি পরবর্তী আইনি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
সাদ্দাম হোসেন প্রায় ২৪ বছর ইরাক শাসন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট হন। এর আগে থেকেই দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তার প্রভাব ছিল প্রবল। তার শাসনামলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা রাজনৈতিক বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি এবং দমন-পীড়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সাদ্দামের ক্ষমতার কাঠামো শুধু সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিল না। গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পারস্পরিক নজরদারি এবং সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে জবাবদিহির ব্যবস্থাও ছিল।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ইরাকে কুর্দি, শিয়া এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। সাদ্দাম সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা হয়েছে। ফলে ওই সময়ের কোনো উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তার পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের তথ্য স্বাভাবিকভাবেই দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই আলানবাগির ঘটনাটি শুধু একজন ব্যক্তির গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতার প্রশ্নও রয়েছে। কুর্দিস্তান২৪ বলেছে, ঘটনাটি এমন প্রশ্ন সামনে এনেছে যে সাদ্দাম সরকারের গোয়েন্দা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে এত বছর সেখানে থাকতে পেরেছেন।
তবে কোনো দেশের সাবেক গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করলেই একজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের আইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী হয়ে যান না। তাকে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি করতে হলে নির্দিষ্ট আইন ভঙ্গের প্রমাণ প্রয়োজন। বিশেষ করে যদি তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই বিষয়টি আলাদা করে প্রমাণ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি স্বৈরশাসন বা সর্বাত্মকতাবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন কি না, সেটি তার প্রবেশ ও অভিবাসন-সংক্রান্ত যোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে ভিসা, আশ্রয়, স্থায়ী বসবাস বা নাগরিকত্বের আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার অভিবাসন-সংক্রান্ত মর্যাদা বাতিল এবং বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এই ধরনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সাধারণত শুধু অতীতের পরিচয় যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তদন্তকারীরা দেখতে পারেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় কী তথ্য দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে কোনো আবেদনে কী ঘোষণা করেছিলেন এবং তার আগের পরিচয়ের সঙ্গে সেসব তথ্যের কোনো অসঙ্গতি ছিল কি না।
সাদ্দাম সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এর আগেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর একটি আলোচিত উদাহরণ হলো ইরাকি সামরিক কর্মকর্তা সাদ তাহা আহমেদ ইউসিফ আল-কায়সি। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় ও নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে সামরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি ইরাকি সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ সময় কাজ করেছিলেন এবং কর্নেল পদে উন্নীত হয়েছিলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার আবেদনে তার সামরিক জীবনের পুরো তথ্য না দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। ওই মামলায় তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় এবং তাকে তিন বছরের পরীক্ষামূলক নজরদারির শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
আলানবাগির ঘটনাতেও তাই মূল প্রশ্ন হতে পারে তার অতীত পরিচয় নয়, বরং সেই পরিচয় যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের কাছে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে তার মামলায় আদালতে কী অভিযোগ আনা হবে, তা এখনো জানা যায়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাদ্দাম সরকারের গোয়েন্দা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য এখনো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ্যে এসেছে। তার বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাকে সাদ্দাম আমলের দমন-পীড়নের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা ঠিক হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য ঘটনাটি অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিদেশি গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের পরিচয় অনেক সময় কয়েক দশক আগের নথি, সাক্ষ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য মিলিয়ে যাচাই করতে হয়। বিশেষ করে পুরোনো শাসনব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ডের তথ্য বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো—আলানবাগির গ্রেপ্তার হয়েছেন তদন্তের পর এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। কুর্দিস্তান২৪ এই তথ্যের পাশাপাশি তার সাদ্দাম আমলের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে দ্য গেটওয়ে পন্ডিটও এইচএসআইয়ের ঘোষণার ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করেছে।
ফলে এখন নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আলানবাগির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয় কি না, তার অভিবাসন-সংক্রান্ত মর্যাদা কী ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় তিনি কী তথ্য দিয়েছিলেন এবং সাদ্দাম সরকারের গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তার প্রকৃত দায়িত্ব কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর সামনে এলে ঘটনাটির গুরুত্ব আরও পরিষ্কার হবে।
এ মুহূর্তে ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন যাচাই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। প্রায় এক যুগ আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা একজন ব্যক্তির বহু পুরোনো পরিচয় পরে তদন্তে উঠে আসা দেখায়, বিদেশি নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যাচাই কতটা জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, কোনো স্বৈরশাসনের পতনের সঙ্গে তার নিরাপত্তা কাঠামোর সদস্যদের অতীতও শেষ হয়ে যায় না। সেই অতীতের তথ্য বহু বছর পরও নতুন কোনো দেশে আইনি ও নিরাপত্তাগত প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন