ছবি: সংগৃহীত
রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে একটি বৃহৎ এবং ঐতিহাসিক দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে জারি করা অধ্যাদেশটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাশের জন্য সুপারিশ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি। এই উদ্যোগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, বিশ্লেষক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশটি আইন আকারে পাশ হলে শুধু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই নয়, বরং দলটির নেতাকর্মীদের বিচারের আওতায় আনার পথও উন্মুক্ত হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অধ্যাদেশটি কিছু সংশোধনীসহ পাশের সুপারিশ করা হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।
প্রশ্ন উঠছে—একটি রাজনৈতিক দলকে আইন করে নিষিদ্ধ করা হলে তা দেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও স্থিতিশীলতার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিষিদ্ধ করলেই কি আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহাসিক ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি রাজনীতি থেকে হঠাৎ বিলীন হয়ে যাবে? তবে আওয়ামী লীগের আমলের দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর বিচার অবশ্যই হতে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইতিহাস বলছে—কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তার প্রভাব পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না। বরং এতে করে রাজনৈতিক সংকট আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, কোনো দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটির বিচার আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে জনগণকে ভোটের মাধ্যমে দলটিকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ দেওয়া হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হতো এবং প্রতিহিংসার অভিযোগ ওঠার সুযোগ কম থাকত বলে তাদের অভিমত।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "দেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির দুটি স্তম্ভের একটি আওয়ামী লীগ। প্রায় আট দশকের ইতিহাস ধারণ করা রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ এবং তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক রয়েছে। নিষিদ্ধ করলেই রাজনীতি থেকে আওয়ামী শক্তি হঠাৎ করে বিলীন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।"
তিনি আরও বলেন, "বিষয়টির সুরাহা সরকারকেই করতে হবে। আর সেটি করতে ব্যর্থ হলে আমাদের ‘সংস্কারকৃত’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।"
ড. সোবহান তার সাক্ষাৎকারে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও বিশ্লেষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, "চব্বিশের আন্দোলনের মধ্যে এমন কিছু গোষ্ঠী ছিল, যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠেছিল এবং চব্বিশের ৫ আগস্টের পর তারা তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে নিয়ে এসেছে। আবার একটি অংশের মধ্যে শেখ হাসিনা ও তার দলের প্রতি প্রবল বিরূপ মনোভাব বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিরূপ মনোভাবে রূপান্তরিত হয়েছিল। এই দুই অবস্থানই ছাত্র আন্দোলনের যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, তার উল্টো ফল বয়ে এনেছে।"
তিনি আরও বলেন, "মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যারা আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই উপস্থিত রয়েছে, তারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সুযোগ নিয়েছে, এর ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং সম্ভবত অভ্যুত্থানের গতিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।"
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জোরালো নির্বাচনী সম্ভাবনাসহ আরও দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা এই সুযোগকে ব্যবহার করে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের যে ঐতিহাসিক সহযোগিতার ভূমিকা, সেটাকে নতুন ভাষ্য দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে কৌশলী নেতাদের নেতৃত্বে তারা এই পর্যায়ে তাদের মুক্তিযুদ্ধ–সম্পর্কিত অবস্থান কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে প্রকাশ করবে।"
ড. সোবহান আরও মনে করেন, শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থানের পেছনেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। তিনি বলেন, "১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যেসব সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা রাষ্ট্রীয় পরিসর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলেছিল। এই ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রবণতার প্রতিক্রিয়াতেই শেখ হাসিনার অবস্থান কঠোর হয়ে ওঠে।"
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কিছু ছাত্রনেতা, যাদের অনেকেই পরবর্তীতে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হন, এ দাবির পক্ষে অবস্থান নেন। তাদের দাবির মুখে ওই বছরের নভেম্বরে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হলে অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তবে বিশ্লেষকেরা বলেন, ওই প্রজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের জন্য কোনো শাস্তির বিধান ছিল না।
অন্যদিকে, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারও জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল। তবে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেয়। এতে বোঝা যায়, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে এবং এটি স্থায়ী সমাধান নয়।
বিএনপি শুরুতে নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে অবস্থান নিলেও পরবর্তীতে দলটির কিছু নেতা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে বক্তব্য দেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্তে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০২৫ সালের ১১ মে এক বিবৃতিতে আনন্দ প্রকাশ করেন।
তবে এই অবস্থানও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। কারণ, একটি দল নিষিদ্ধ হলে এর দায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর বর্তাতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজ আনাম আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অর্জনের ওপর জোর দিয়ে নিজের লেখা উপসম্পাদকীয়তে বলেন, "আওয়ামী লীগের গর্বিত হওয়ার মতো অসংখ্য কারণ রয়েছে। তাদের রয়েছে ঈর্ষণীয় সব অর্জন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য রাজনৈতিক দলের তুলনায় আওয়ামী লীগের রেকর্ড অসামান্য বলে বিবেচনা করা যায়।"
তিনি আরও বলেন, "টানা ১৭ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য উন্নয়ন অর্জন করেছেন। অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে (যদিও ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি বড় আকারে প্রশ্নবিদ্ধ) তার অসাধারণ অর্জন প্রশংসার দাবিদার। উন্নয়নের ধারায় বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অগ্রগতি অবশ্যই রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনার যোগ্য ও অবিচল নেতৃত্বের ফল।"
মাহফুজ আনাম আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক শেকড়ের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ছিল দেশের সব ধরনের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রচয়িতা ও মূল চালিকাশক্তি।"
এদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। দলটির মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, "বিএনপিকে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পূর্ণ দায় নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এর ফলে যে পরিণতি হবে, তা বিএনপিকেই ভোগ করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "ভুলে গেলে চলবে না যে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী। মনে রাখবেন, জনমত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তন ইতোমধ্যেই আরও তীব্র হতে শুরু করেছে।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে গণমাধ্যম বলেন, "এখানে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তো কোনো মামলা হয়নি। কিংবা আদালত তো আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেনি। এখন এটি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার যে একটি দলকে রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করবে নাকি জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ পাবে।"
তিনি আরও বলেন, "আওয়ামী লীগ একাত্তরেও নিষিদ্ধ হয়েছিল। এখন মামলা হলে আদালত রায় দিত। কিন্তু সরকার সে পথেও যাচ্ছে না। জনগণ ভোট না দিলে দলটি ব্রাত্য হয়ে পড়তো। কিন্তু সরকার ও সমমনা দলগুলো এখনো আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে নিষিদ্ধ করে রাখতে চাইছে বলেই এটিকে প্রতিহিংসা মনে হতে পারে।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন আরও কঠোর ভাষায় একটি গণমাধ্যমকে বলেন, "রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা ঐতিহাসিকভাবেই কখনো কারও জন্য সুফল বয়ে আনেনি, বরং যারা করেছে তাদের ঐতিহাসিক দায় নিতে হয়েছে।"
তিনি বলেন, "এদেশে আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার ও সমর্থক আছে। মানুষ দলটিকে গ্রহণ করবে কি-না সেটি যাচাই করার সুযোগ অন্তর্বর্তী সরকার নষ্ট করেছে। কোনো অর্থেই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বন্ধ করা বা দল নিষিদ্ধ করা কাউকে সাময়িক তৃপ্তি কিংবা প্রতিহিংসা মেটানোর স্বাদ দিতে পারে কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে দেশ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি মোটেও ভালো পদক্ষেপ নয়।"
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, একটি ঐতিহাসিক ও বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ শুধু আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি দেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, এমন সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
কারণ, রাজনীতিতে কোনো শক্তিকে আইন দিয়ে সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায় না—বিশেষ করে যখন সেই শক্তির শিকড় সমাজের গভীরে প্রোথিত। বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই রাজনৈতিক শক্তির উত্থান-পতন হওয়া উচিত—এমনটাই মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক।
খবরটি শেয়ার করুন