ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ একাধিক শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এর প্রভাব পড়েছে লাইফস্টাইল–সম্পর্কিত শিল্পেও। এই তালিকায় কনডমের মতো পণ্যও রয়েছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।
কনডম উৎপাদনে ব্যবহৃত পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য, অ্যামোনিয়া ও সিলিকন অয়েলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দাম বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। খুচরা বিক্রিতেও এর প্রভাব পড়েছে।
কনডম উৎপাদন শিল্পের সূত্রগুলো বলছে, ভারতের আট হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে অ্যামোনিয়ার দাম ৪০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে সিলিকন তেলের দামও বাড়তে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “কেউ ভাবেনি যে এই শিল্পে কোনো সমস্যা হবে। তবে কনডম এখন লাইফস্টাইল পণ্যে পরিণত হয়েছে এবং এই ব্যবসার যেকোনো প্রভাব মানুষের ওপরও পড়ে।”
ল্যাটেক্সকে স্থিতিশীল করতে এবং অতিরিক্ত প্রোটিন সরিয়ে ফেলতে অ্যামোনিয়া ব্যবহার করা হয়। কনডমের ওপর সিলিকন অয়েলের আস্তরণ থাকে, যা লুব্রিক্যান্ট হিসেবে কাজ করে।
ল্যাটেক্স হলো দুধের মতো সাদা একটি তরল, যা প্রাকৃতিকভাবে নিষ্কাশিত হয় অথবা পেট্রোলিয়ামভিত্তিক পলিমারাইজেশনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়। এর উচ্চ স্থিতিস্থাপকতা ও প্রসারণ ক্ষমতা রয়েছে এবং এটি জলরোধী। ল্যাটেক্স প্রাকৃতিক রাবার পণ্য, ফোম ম্যাট্রেস, দস্তানা, রং, পোশাক এবং আঠা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং তার ফলে খুচরা বিক্রিতে প্রভাব—এই প্রসঙ্গে এটিই একমাত্র উদ্বেগের কারণ নয়। যারা জনসংখ্যা, পরিবার পরিকল্পনা এবং এইডস নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কাছেও এটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
‘পপুলেশন ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়া’র নির্বাহী পরিচালক পুনম মুতরেজা বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুফল পেতে হলে মানুষের কাছে গর্ভনিরোধক পৌঁছানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং গর্ভনিরোধে পুরুষদের দায়িত্বও স্বাভাবিক করতে হবে।
“কনডমের ঘাটতি বা দাম বাড়লে কিশোরীদের মধ্যে গর্ভধারণের ঘটনা বাড়তে পারে,” বলেন তিনি। এইচএলএল লাইফ কেয়ার লিমিটেডের এক মুখপাত্র বলেন, “পিভিসি ফয়েল, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, পলিকেমিক্যাল এবং প্যাকেজিং উপকরণের মতো মূল উপাদানের দাম ওঠানামা এবং কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ—দুটিই প্রভাবিত হতে পারে।”
কেরালার তিরুবনন্তপুরমে অবস্থিত এই সংস্থাটি প্রায় ৬০ বছর আগে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল দেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে মাথায় রেখে।
কেরালায় প্রচুর রাবার বাগান থাকায় এই সংস্থাটি সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সাতটি স্থানে তাদের উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। সংস্থাটি এখন কনডম, হাসপাতালের নানা সরঞ্জাম ও ওষুধ উৎপাদন করে, তাদের প্রধান লক্ষ্য নারীদের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন।
রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থা বছরে প্রায় ২০০ কোটি কনডম উৎপাদন করে, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ। ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে তারা পরিবার পরিকল্পনা ও জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির জন্য ১০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের কনডম সরবরাহ করেছে। তারা ৮৭টির বেশি দেশে পণ্য রপ্তানি করে।
যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তার প্রধান কারণ হলো সরবরাহ ও লজিস্টিকস–সংক্রান্ত সমস্যা। এক কর্মকর্তা বলেন, “জাহাজের কন্টেইনার সংকটের কারণে বিদেশে পণ্য পাঠাতে দেরি হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সমুদ্রপথে সময় বেশি লাগছে।”
“কেপ অফ গুড হোপ হয়ে জাহাজ পাঠাতে আরও ১৫–২০ দিন বেশি সময় লাগছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় বিধিনিষেধ থাকায় বিমান পরিবহনও কমেছে, ফলে পণ্য জমে যাচ্ছে।”
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামালের ঘাটতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে খরচ বৃদ্ধি ও সরবরাহ সমস্যার কারণে উৎপাদনে প্রভাব পড়বে।
মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওয়ের কিউপিড লিমিটেডও একই সমস্যার মুখোমুখি।
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার আর বাবু বলেন, “সিলিকন অয়েল ও অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের দাম নিয়ন্ত্রণে নেই। ল্যাটেক্সের দামও বাড়ছে।”
“উৎপাদন খরচ বাড়লেও আমরা পুরোটা বাজারে চাপাতে পারি না। এটি বড় চ্যালেঞ্জ।” তিনি জানান, তাদের ৮০ শতাংশ পণ্য রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপ ও ব্রাজিলে রপ্তানি হয়, তবে পরিবহন সংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওষুধ শিল্পেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। ইন্ডিয়ান ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র বিরঞ্চি শাহ বলেন, “রপ্তানিতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। জাহাজ ও বিমান—দুটোর ক্ষেত্রেই পরিবহন ব্যয় ও সময় বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “যেসব ওষুধের কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যালের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোর দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ঘাটতির চেয়ে জল্পনা বেশি।”
পরিবার পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা কনডমের দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
পুনম মুতরেজা বলেন, “ভারতে গর্ভনিরোধকের বিকল্প ব্যবস্থার প্রসার বাড়াতে হবে এবং পুরুষদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।”
“দাম বাড়লে বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ব্যবহার কমে যেতে পারে, যা অর্জিত সাফল্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।” তিনি বলেন, “এতে অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়বে এবং নারীদের ওপর চাপও বাড়বে।”
ভারতে কনডম ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম। এনএফএইচএস-৫ অনুযায়ী, মাত্র ৯ শতাংশ বিবাহিত দম্পতি এটিকে প্রধান পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করে। সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—ক্রেতাদের কি বেশি দাম দিতে হবে?
শিল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “যুদ্ধ যত দ্রুত শেষ হবে, সবার জন্য ততই ভালো হবে।”
খবরটি শেয়ার করুন