ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য—‘বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধে জাদুঘর’। এই প্রতিপাদ্যের মূল কথা হলো, জাদুঘর কেবল অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণের জায়গা নয়; এটি বিভক্ত মত, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করারও একটি মাধ্যম।
কিন্তু দেশে দিবসটি ঘিরে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় জাদুঘরকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা উল্টো এক ধরনের প্রশ্ন সামনে এনেছে—জাদুঘর কি সত্যিই সেতুবন্ধন তৈরি করছে, নাকি ইতিহাসের কিছু অংশকে আড়াল করে নতুন বিভাজনের জন্ম দিচ্ছে?
দৈনিক খবরের কাগজে আজ সোমবার (১৮ মে) ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জাদুঘর থেকে অপসারণ’ শিরোনামের একটি বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন সাংবাদিক শাহনাজ পারভীন এলিস। সেই প্রতিবেদনে জাতীয় জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন উপাদানের উপস্থাপনা পরিবর্তন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে আগের দৃশ্যমান উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং দর্শনার্থীদের উদ্বেগের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
এসব অভিযোগের বিপরীতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষও তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু দুই পক্ষের বক্তব্যের মাঝখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে—রাষ্ট্রের ইতিহাস কে লিখবে, কীভাবে লিখবে এবং কোন অংশকে কতটা গুরুত্ব দেবে?
জাতীয় জাদুঘর শুধু একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের রাষ্ট্রীয় স্মৃতির প্রধান ভান্ডার। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত। ফলে এখানে কী দেখানো হচ্ছে এবং কী দেখানো হচ্ছে না—তা কেবল প্রদর্শনীর বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
প্রতিবেদনে কয়েকজন দর্শনার্থী অভিযোগ করেছেন যে, বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে আগের মতো আলাদা গ্যালারি বা শক্তিশালী উপস্থাপনা আর নেই। একজন দর্শনার্থী প্রশ্ন তুলেছেন, স্বাধীনতার ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ছয় দফা আন্দোলন বা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তার নেতৃত্বের দৃশ্যমান উপস্থাপনা পর্যাপ্তভাবে চোখে পড়েনি।
এখানে একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই—দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক বিষয়। তার ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তার উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেবে।
ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে বাদ দেওয়া আর ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা—এই দুটি বিষয় এক নয়। যদি নতুন উপস্থাপনার নামে ইতিহাসের কোনো কেন্দ্রীয় অংশ দৃশ্যমানতা হারায়, তাহলে সেটি ইতিহাসের ভারসাম্য তৈরির পরিবর্তে উল্টো নতুন ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, কোনো নিদর্শন ধ্বংস করা হয়নি; নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু উপাদান সরিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ২০২৪–এর ঘটনাপ্রবাহকে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগের কথা বলেছে।
এই ব্যাখ্যার মধ্যে একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। ইতিহাস কখনো স্থির নয়। নতুন গবেষণা হবে, নতুন দলিল পাওয়া যাবে, নতুন ব্যাখ্যাও যুক্ত হবে। আধুনিক জাদুঘরগুলো শুধু পুরোনো ছবি দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখে না; তারা গল্প বলে, অভিজ্ঞতা তৈরি করে এবং দর্শনার্থীকে ইতিহাসের ভেতরে নিয়ে যেতে চায়। ভিডিও, অডিও গাইড বা ডিজিটাল উপস্থাপনা সেই অর্থে সময়োপযোগী উদ্যোগ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইতিহাসের পরিসর বাড়ানোর প্রক্রিয়া কি বিদ্যমান ইতিহাসকে সংকুচিত করার মাধ্যমে হওয়া উচিত? যদি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের জায়গা কমে যায়, কিংবা নতুন রাজনৈতিক ঘটনার স্মৃতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর উপস্থিতি কম দৃশ্যমান হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বিশ্বের বড় বড় জাতীয় জাদুঘরগুলো সাধারণত ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে সম্প্রসারণ করে; প্রতিস্থাপন করে না। অর্থাৎ নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়, পুরোনো অধ্যায় মুছে যায় না। দেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই রাষ্ট্রগঠনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি মুক্তিযুদ্ধ। আর সেই ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের অংশ।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর তৈরির উদ্যোগও এই প্রেক্ষাপটে আলোচনার দাবি রাখে। নতুন প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ রাষ্ট্রের ইতিহাস কেবল অতীতে থেমে থাকে না। কিন্তু নতুন স্মৃতির জন্য পুরোনো স্মৃতিকে আড়াল করা হলে সেটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। জাদুঘর শুধু সরকারের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জনগণেরও প্রতিষ্ঠান। ফলে জাদুঘরের উপস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনার আগে ইতিহাসবিদ, গবেষক, মুক্তিযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কারণ ইতিহাস শুধু তথ্যের সংগ্রহ নয়; এটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। আজ আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসে তাই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—জাদুঘর কি স্মৃতি সংরক্ষণ করছে, নাকি স্মৃতির বিন্যাস বদলাচ্ছে?
জাদুঘরের কাজ কোনো ইতিহাসকে অদৃশ্য করে দেওয়া নয়, আবার কোনো ইতিহাসকে একক আধিপত্যও দেওয়া নয়। বরং ইতিহাসের জটিলতা, বহুমাত্রিকতা ও ধারাবাহিকতাকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে আগামী প্রজন্ম নিজেদের অতীতকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে পারে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপদ ভুলে যাওয়া নয়; বরং আংশিকভাবে মনে রাখা।
খবরটি শেয়ার করুন