ফাইল ছবি
ঈদ সামনে এলেই দেশে একটি পরিচিত দৃশ্য ফিরে আসে—ঢাকার বাস টার্মিনাল, মহাসড়ক, ফেরিঘাট ও সেতু এলাকায় বাড়তে থাকে মানুষের চাপ। লাখো মানুষ কয়েক দিনের মধ্যে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চল ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছুটে যান পরিবারের কাছে। কিন্তু এ বছরের ঈদুল আজহা সামনে রেখে যে চিত্র উঠে আসছে, তা শুধু স্বাভাবিক যাত্রাচাপের নয়; বরং দেশের প্রধান মহাসড়কজুড়ে অসমাপ্ত নির্মাণকাজ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা এবং সীমিত ব্যবস্থাপনার সমন্বিত সংকটের।
হাইওয়ে পুলিশ ইতোমধ্যে দেশের সাতটি প্রধান জাতীয় মহাসড়কে ৯৪টি যানজটপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের প্রতিবেদন, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ এবং যান চলাচলের তথ্যের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি হয়েছে। একই ধরনের উদ্বেগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মূলধারার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, চলমান সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, টোল ব্যবস্থাপনা, অস্থায়ী পশুর হাট, অযোগ্য যানবাহন এবং নিয়ন্ত্রণহীন পার্শ্বগত যান চলাচল মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বাইপাইল, কাঞ্চন সেতুর সংযোগ সড়ক ও এশিয়ান হাইওয়ের কিছু অংশ, কাঁচপুর সেতুর কাছে যাত্রামোড়া এলাকা এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকা। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রয়েছে ২৫টি করে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ৮টি এবং ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৭টি করে পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতি বছর একই ধরনের আশঙ্কা কেন ফিরে আসে?
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক সমস্যা হলো—দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নকাল ও জাতীয় উৎসবের সময়সূচির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে একইসঙ্গে নির্মাণকাজ চলতে থাকে, যা স্বাভাবিক চলাচলের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পরিস্থিতি তার একটি বড় উদাহরণ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং এশিয়ান হাইওয়েতে সংস্কার ও উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় কাঁচপুর, যাত্রামোড়া, বরাব, রূপসী ও ভুলতা এলাকায় কয়েক দিন ধরেই যানজটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বৃষ্টির কারণে সড়কের খানাখন্দে পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
তারাব মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ এক যাত্রী মোছা. সাথীর অভিজ্ঞতা এই সংকটের মানবিক দিকও সামনে আনে। তিনি জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে পাঁচ মিনিট পরপর বাস পাওয়া গেলেও যানজটের কারণে আধাঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাস পাচ্ছিলেন না।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) সোহেল রানাও স্বীকার করেছেন, নির্মাণকাজের কারণে সড়ক সরু হয়ে গেছে এবং বৃষ্টির কারণে তিনটি মহাসড়কেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সাভারের ঢাকা-আশুলিয়া সড়কে। যাত্রীরা জানিয়েছেন, আগে যে পথ পাড়ি দিতে ৪৫ মিনিট লাগত, এখন সেখানে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে। জলাবদ্ধতা, খানাখন্দ এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পূর্বের ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং শিল্পকারখানার প্রভাবে জলাবদ্ধতা বাড়ছিল। তিনি বলেন, এক্সপ্রেসওয়ের পিলার নির্মাণের কারণে সড়কেরও ক্ষতি হয়েছে। তবে ঈদের আগে সাড়ে তিন কিলোমিটার অংশ খুলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে এলেঙ্গা ফ্লাইওভার। টাঙ্গাইলের পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যানবাহন এই মহাসড়ক ব্যবহার করে, ঈদের সময় যা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলেঙ্গা ফ্লাইওভারের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং বৃষ্টি হলে সেখানে যান চলাচল আরও ধীর হতে পারে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ গোল চত্বর থেকে সরাইল বিশ্বরোড পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশেও তীব্র যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। আশুগঞ্জ-আখাউড়া চার লেন প্রকল্পের ধীরগতি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের পাশে যানবাহন পার্কিং এবং অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও বড় কারণ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাগুলো নতুন নয়; সমস্যা হচ্ছে কার্যকর বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ে। ঈদের সময় অতিরিক্ত যানবাহন, ক্লান্ত চালক, অযোগ্য যানবাহন এবং অপরিকল্পিত চলাচল দুর্ঘটনা ও যানজট—দুটিরই ঝুঁকি বাড়ায়।
হাইওয়ে পুলিশের প্রস্তুতিও প্রশ্নের বাইরে নয়। বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৩০ জন সদস্য এবং মাত্র ৯৯টি টহল পিকআপ ভ্যান দিয়ে ৩ হাজার ৯৯০ কিলোমিটারের বেশি জাতীয় মহাসড়ক এবং ৪২৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়ক তদারকি করতে হয়। অর্থাৎ একটি টহলযানের ওপর গড়ে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার এলাকার দায়িত্ব পড়ে। এর মধ্যে সাতটি যান বর্তমানে অকেজো।
যদিও পুলিশ জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ টোলপ্লাজা, সেতুর সংযোগ সড়ক এবং নির্মাণ এলাকায় মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্স, উদ্ধারকারী দল এবং রেকার মোতায়েন করা হবে। ঈদের আগে ডেপুটেশনে প্রায় ৯৯০ অতিরিক্ত সদস্যও যুক্ত হতে পারেন। তবে মূল প্রশ্ন থেকে যায়—এসব ব্যবস্থা কি যথেষ্ট?
দেশের ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতা বলে, যানজট শুধু রাস্তার সমস্যা নয়; এটি পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং বাস্তবায়নেরও সমস্যা। কয়েক বছর আগে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আবার কিছু মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হওয়ায় যাত্রা তুলনামূলক সহজও হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন নির্মাণকাজ, অসমাপ্ত প্রকল্প এবং নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি নতুন সংকটও তৈরি করেছে।
ঈদের কয়েক দিন আগে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত, মহাসড়কের পাশের অস্থায়ী পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ, অযোগ্য যানবাহন বন্ধ, টোল ব্যবস্থাপনা সহজ করা এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা না গেলে এবারের ঈদযাত্রায় পুরোনো দুঃস্বপ্ন আবারও ফিরে আসতে পারে। আর তখন কোটি মানুষের যাত্রা কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর নয়, দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পরীক্ষায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
খবরটি শেয়ার করুন