রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৭ জন কারাগারে *** দফায় দফায় হামলা, ধ্বংসস্তূপ থেকে যেভাবে বেঁচে ফিরলেন মোজতবা খামেনি *** জাসদ কার্যালয়ে হামলা, মব সৃষ্টি ও আটকের ঘটনায় আসকের নিন্দা *** ঢাকায় তিন দিনে চার স্থানে হামলা-ভাঙচুর-লুট, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা *** দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি *** পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করা ২৮ সশস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যার দাবি তালেবানের *** হামের উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু, মোট ১০৯৬ *** ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, এক দিনে সর্বোচ্চ ২১৫৮ জন ভর্তি *** ভারত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযানের জন্য প্রস্তুত: রাজনাথ সিং *** ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে উত্তাল পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, কর্তৃপক্ষ বলছে গুজব

সুখবর এক্সপ্লেইনার

ফুল বিক্রি থেকে মাদক ব্যবসায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশুদের অন্ধকার জীবন

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন, ২৬শে জুন ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বহুদিন ধরেই নাগরিকদের অবসর, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কিন্তু এ উদ্যানের আরেকটি অন্ধকার বাস্তবতা অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে। দিনের আলোতেই এখানে ঘুরে বেড়ায় এমন একদল শিশু, যাদের কারও হাতে ফুল, কারও হাতে পানির বোতল, আবার কারও হাতে থাকে মাদকের ছোট ছোট প্যাকেট।

ফুল বিক্রেতা থেকে মাদক বহনকারী হয়ে ওঠার এই যাত্রা কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গল্প নয়; এটি দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার সম্মিলিত ফল।

প্রায় ১০ বছর বয়সী সাদিক (ছদ্মনাম) সেই বাস্তবতারই একটি প্রতীক। ছোটবেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারানোর পর ক্র্যাচের সাহায্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ফুল বিক্রি করত সে। তাতে সংসার চলছিল না। বাড়তি আয়ের আশায় তার মা তাকে আবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে আসেন।

এরপর ফুল বিক্রির পাশাপাশি ধীরে ধীরে সে জড়িয়ে পড়ে মাদক বিক্রির সঙ্গে। এখন উদ্যানের একটি চক্রের হয়ে কাজ করে সে।

শুধু সাদিক নয়, উদ্যানে এমন আরও বহু শিশু রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছে মাদকচক্র। কারণ, শিশুদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া আলাদা। আটক হলেও অল্প সময়ের মধ্যে অনেকেই মুক্তি পেয়ে যায়। এই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে চক্রগুলো।

উদ্যানের ভেতরে 'ফুল ক্যানটিন' নামে পরিচিত একটি স্থানে প্রতিদিনই ভিড় জমে। বাইরে থেকে সেটি সাধারণ আড্ডার জায়গা মনে হলেও স্থানীয়দের দাবি, এখান থেকেই পরিচালিত হয় মাদক ব্যবসার একটি বড় অংশ। সেখানে বসে থাকা কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে খেলাধুলা করে শিশুরা। কিন্তু এই সম্পর্ক কেবল স্নেহের নয়, বরং নিয়ন্ত্রণেরও।

সাদিকের ভাষায়, "আমরা সবাই এক পরিবার।" এই 'পরিবার' শব্দটির আড়ালে রয়েছে একটি বিকল্প সামাজিক কাঠামো, যেখানে জন্ম, বেড়ে ওঠা, বিয়ে, এমনকি মৃত্যুও ঘটে একই পরিসরে। রাষ্ট্র ও পরিবার যেখানে ব্যর্থ, সেখানে অপরাধচক্রই হয়ে উঠেছে তাদের আশ্রয়দাতা।

শাহবাগ থানার কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, আগে যারা ফুলের ব্যবসা করতেন, তাদের কয়েকজন পরে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। সেই সূত্র ধরেই ভাসমান শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে বাহক হিসেবে। পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও এই চক্র পুরোপুরি ভাঙা যাচ্ছে না। অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লেই বিক্রেতারা দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। কেউ গাঁজার প্যাকেট মাটিতে ফেলে দেয়, কেউ পোশাকের গোপন অংশে লুকিয়ে রাখে।

উদ্যানে বসবাসকারী স্মৃতি ও মোহাম্মদ আকাশের জীবনও একই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। দুজনের পরিচয়, সংসার—সবই এই উদ্যানকে ঘিরে। আকাশ প্রায় এক যুগ ধরে এখানে আছেন। স্মৃতির জীবনের প্রায় ৩০ বছর কেটেছে এই এলাকায়। একসময় ফুল বিক্রি করলেও পরে তারা গাঁজা বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভয় পেলে একজন বিক্রি করেন, অন্যজন পাহারা দেন। প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।

এই ব্যবসারও রয়েছে নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো। স্থানীয়দের দাবি, আগে 'মুক্তা খালা' নামে পরিচিত এক নারী শহীদ মিনার থেকে খিচুড়ি পট্টি পর্যন্ত পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার মৃত্যুর পর নেতৃত্বে আসে নতুন কয়েকটি গ্রুপ। বর্তমানে নবী, আলিকা, রেখা খালা ও রাব্বির নেতৃত্বাধীন কয়েকটি দল সক্রিয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাদের দাবি অনুযায়ী, নতুনদের প্রথমে ছোটখাটো কাজ দেওয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে বড় ব্যবসায়ীদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠে তারা। এরপর শুরু হয় এলাকা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মতোই পরিচালিত হয়।

গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে কেন্দ্র করে মাদক, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং ভাসমান মানুষের জীবন নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে, পথশিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে মাদক ব্যবসা, যৌন নির্যাতন, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আগের জরিপগুলো দেখায়, রাজধানীতে বসবাসকারী পথশিশুদের বড় অংশই নিয়মিত শিক্ষার বাইরে। অনেকের কোনো জন্মনিবন্ধন নেই, স্থায়ী ঠিকানা নেই, এমনকি পারিবারিক পরিচয়ও অস্পষ্ট। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাদের আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা অপরাধী নয়; তারা অপরাধের শিকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খায়রুল চৌধুরীর মতে, মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শিশু নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তার ভাষায়, "পথশিশু কোনো স্বাভাবিক পরিচয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও পরিবারের সংকটের বহিঃপ্রকাশ।"

শিশু অধিকারকর্মীরাও একই ধরনের মত দেন। তাদের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে শিশুদের ধরে নিয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, কয়েকদিন পর তারা আবার একই পরিবেশে ফিরে আসে। যে পরিবারে দারিদ্র্য, সহিংসতা বা মাদক রয়েছে, সেখানে ফিরে গিয়ে শিশুরা আবার একই চক্রে জড়িয়ে পড়ে।

শিশু আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুকে গ্রেপ্তার বা বিচার করার ক্ষেত্রেও বিশেষ বিধান রয়েছে। আইনটির মূল উদ্দেশ্য শাস্তি নয়, পুনর্বাসন। কিন্তু বাস্তবে পুনর্বাসন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট এবং পর্যাপ্ত সামাজিক কর্মীর অভাবে সেই লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনাপ্রবাহ আরও একটি বাস্তবতা সামনে আনে—অপরাধচক্র শিশুদের শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের সদস্য হিসেবেও তৈরি করছে। প্রথমে বাহক, পরে বিক্রেতা, এরপর নিয়ন্ত্রক—এভাবেই তৈরি হচ্ছে অপরাধের ধারাবাহিকতা।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন। প্রথমত, উদ্যানকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ মাদকচক্র ভেঙে দিতে গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভাসমান শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

তৃতীয়ত, যেসব পরিবার চরম দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও বাড়াতে হবে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গল্প তাই কেবল একটি পার্কের গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে একটি শিশু ফুল বিক্রি করতে করতে একসময় মাদক বিক্রি শুরু করে, কারণ তার সামনে অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সেই বাস্তবতা বদলে দেওয়া, যেখানে একটি শিশুর কাছে ফুল আর মাদকের মধ্যে পার্থক্য শুধু আয়ের অঙ্কে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্র যদি এই শিশুদের জন্য নিরাপদ বিকল্প তৈরি করতে না পারে, তবে আজকের সাদিকই আগামী দিনের সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নতুন মুখ হয়ে উঠবে। তখন দায় শুধু একটি চক্রের নয়, পুরো সমাজেরই থাকবে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250