ফাইল ছবি
দেশের পাসপোর্টে আবারও ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধ পুনর্বহালের উদ্যোগ এবং ই-পাসপোর্টের জলছাপে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতীক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়, রাজনৈতিক দর্শন এবং জাতীয় প্রতীক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন সরকারের এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামাজিক পরিসরে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে দেশের পররাষ্ট্রনীতি, জনমত এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে যে অবস্থান রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ পুনরায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট চালুর সময় এই অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে বিষয়টি বাদ পড়লেও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি।
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ লেখা থাকুক বা না থাকুক, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক নীতিতে বাস্তবিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ রাষ্ট্রীয় নীতির ভিত্তি নির্ধারিত হয় সাংবিধানিক অবস্থান, সরকারি কূটনৈতিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে। তবে প্রতীকী দিক থেকে বিষয়টির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তাদের মতে, একটি দেশের পাসপোর্ট কেবল ভ্রমণের নথি নয়; এটি সেই রাষ্ট্রের পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিক চেতনারও একটি প্রতিফলন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ পুনর্বহাল মূলত অভ্যন্তরীণ জনমতের প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের প্রতি জনসমর্থন শক্তিশালী। ফলে এই সিদ্ধান্ত জনমানসে একটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তবে তারা একই সঙ্গে মনে করেন, বর্তমান বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু প্রতীক বা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে শুধু ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ নয়, পাসপোর্টের অভ্যন্তরে থাকা জলছাপেও বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান ই-পাসপোর্টে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীক সংযোজন করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, বঙ্গবন্ধু সেতু, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন ছবি বাদ দেওয়া হচ্ছে।
এর পরিবর্তে যুক্ত হচ্ছে বঙ্গভবন, জামদানি শাড়ি, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, টাঙ্গুয়ার হাওর, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, আহসান মঞ্জিল, শালবন বিহার, নীলগিরি, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং ঐতিহাসিক পানামনগরীর মতো বিষয়গুলো। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিও যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই মূল বিতর্কের জায়গা তৈরি হয়েছে। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতীকের প্রশ্নে প্রায়ই রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। একটি সরকার যখন রাষ্ট্রীয় প্রতীক নির্ধারণ করে, তখন সেখানে ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক আদর্শের একটি মিশ্রণ কাজ করে।
তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পভিত্তিক ছবি বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে আরও দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি দিতে পারে। কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা নির্দিষ্ট সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক প্রতীক তুলনামূলকভাবে স্থায়ী পরিচয় বহন করে।
তবে ইতিহাসবিদদের একটি অংশ আবার সতর্কতার কথাও বলছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় নথিতে ব্যবহৃত প্রতীক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। কারণ একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস কখনও একক কোনো ব্যক্তি, দল বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার প্রতিফলন ঘটানোই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
তারা মনে করেন, একটি সরকার ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের প্রতীক সরিয়ে নতুন প্রতীক যুক্ত করলে ভবিষ্যতে আবার অন্য সরকারও একই ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারে। এতে জাতীয় প্রতীকের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে এসব পরিবর্তন কার্যকর হবে। পুরোনো পাসপোর্টধারীদের তাৎক্ষণিক কোনো জটিলতায় পড়তে হবে না। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়নের সময় নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট দেওয়া হবে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য এটি হঠাৎ কোনো প্রশাসনিক চাপ তৈরি করবে না।
প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-পাসপোর্টের জলছাপ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি নিরাপত্তার অংশও। তাই নতুন প্রতীক যুক্ত করার সময় প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান এবং জালিয়াতি প্রতিরোধের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ পুনর্বহাল এবং পাসপোর্টের জলছাপ পরিবর্তন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বেশি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে। এটি একদিকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানের একটি পুনঃউচ্চারণ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিজ্যুয়াল ভাষায় নতুন সংযোজন ও বিয়োজনের উদ্যোগ।
রাষ্ট্রের প্রতীক কী হবে, কোন ছবি থাকবে, কোনটি বাদ যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু নকশাগত নয়; বরং এগুলো একটি দেশের আত্মপরিচয়, ইতিহাসবোধ এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনারও প্রতিফলন। তাই এই পরিবর্তনকে অনেকেই শুধু পাসপোর্টের নকশা পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না; বরং রাষ্ট্রীয় বয়ানের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবেও বিবেচনা করছেন।
খবরটি শেয়ার করুন