রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক: উগ্রবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১২ জন ৩ দিনের রিমান্ডে *** কেরানীগঞ্জে থানার সামনে ট্রাকে আগুন, আব্দুল্লাহপুরে ককটেল বিস্ফোরণ *** রাজধানীর মিরপুর ও মধ্যবাড্ডায় ৩ বাসে অগ্নিসংযোগ, যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণ *** ‘আসিফ মাহমুদের দুর্নীতি ও লুটপাটের গডফাদার ড. ইউনূস’ *** শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই সরকারের ওপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করতে চায় আওয়ামী লীগ

পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা: আবেগের ট্রেনে উঠব, নাকি যুক্তির বাসে?

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ১২:৪১ পূর্বাহ্ন, ১২ই জুন ২০২৬

#

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন। ছবি: সংগৃহীত

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন

আমরা মাঝেমধ্যে এমন জায়গায় আলো খুঁজি, যেখানে বাতিটাই অনেক দিন ধরে ফিউজ হয়ে আছে। আবার, সেই ফিউজ বাতির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ ঘোষণা দেন, “এই আলোই আসল আলো।” এখন বাংলাদেশে পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়ার নামে যে নতুন ধরনের আগ্রহ, আহ্বান, প্রচার কিংবা আবেগের বাজার তৈরি হচ্ছে, সেটিও সেই ফিউজ বাতির সামনে আলো খোঁজার মতো।

সামরিক দিক দিয়ে পাকিস্তান একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। সে দেশে ভালো মানুষ আছে, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আছে, সমৃদ্ধ সাহিত্য আছে, প্রতিভাবান তরুণ আছে। পাকিস্তানে Quaid-i-Azam University, LUMS, PIEAS-এর মতো কিছু ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত। সুতরাং পাকিস্তানকে এক কথায় অন্ধকার বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি পাকিস্তানকে হঠাৎ উচ্চশিক্ষার স্বর্গ বানিয়ে প্রচার করাও দায়িত্বজ্ঞানহীন।

উচ্চশিক্ষা কোনো ক্রিকেট ম্যাচ নয় যে, পুরোনো আবেগে পতাকা ওড়ালেই জয় হয়ে গেল। উচ্চশিক্ষা হলো ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, গবেষণা, শিক্ষক, শিল্প-সংযোগ, স্বাধীন চিন্তা, নিরাপদ ক্যাম্পাস, আন্তর্জাতিক মান আর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি। এখানে আবেগ দিয়ে ভর্তি হওয়া যায়, কিন্তু ক্যারিয়ার বানানো যায় না।

গত দুই দশকে পাকিস্তান নিজেই নানা সংকটে ঘেরা। রাজনৈতিক অস্থিরতা সেখানে নিয়মিত অতিথি; গণতন্ত্র প্রায়ই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, আর ক্ষমতার আসল ঘর দখল করে থাকে অন্য শক্তি।

রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর সেনাবাহিনীর প্রভাব, নির্বাচনী অনিশ্চয়তা, বিরোধী রাজনীতির দমন, সংবাদমাধ্যমের চাপ—তার ওপর পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির। বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ার মতো অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি তৎপরতা, সীমান্ত উত্তেজনা, ধর্মীয় উগ্রবাদ—এসব কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে লেখা না থাকলেও উচ্চশিক্ষার পরিবেশে তার ছায়া পড়ে।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভবন নয়; বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্ত বাতাস। যে দেশে বাতাসে ভয় মেশে, সেখানে চিন্তার জানালা কতটা খোলা থাকে, সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতার দিকেও তাকাতে হবে। যে তরুণ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবে, তার শুধু ডিগ্রি নয়, জীবনযাপনের নিরাপত্তাও জরুরি। বাবা-মা সন্তানকে বিদেশে পাঠান স্বপ্ন নিয়ে; দুশ্চিন্তার অ্যালার্ম ঘড়ি হাতে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য নয়।

পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা বুঝতে হলে আগে তার স্কুলশিক্ষার ভিত্তিটা দেখতে হয়। World Bank-এর Learning Poverty Brief 2024 বলছে, পাকিস্তানে late primary age-এর ৮০ শতাংশ শিশু পড়ালেখায় ন্যূনতম দক্ষতায় পৌঁছাতে পারে না; ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায়ের শেষে minimum proficiency অর্জন করে না; আর ৩২ শতাংশ প্রাথমিক বয়সী শিশু স্কুলে নেই। UNICEF Pakistan আরও কঠিন ছবি দেয়: ৫–১৬ বছর বয়সী প্রায় ২৫.১ মিলিয়ন শিশু স্কুলের বাইরে, যা ওই বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ।

অর্থাৎ যে রাষ্ট্র নিজের শিশুদের বড় অংশকে মৌলিক শিক্ষার সিঁড়িতেই ধরে রাখতে পারছে না, সেই রাষ্ট্র হঠাৎ করে বিদেশি তরুণদের জন্য উচ্চশিক্ষার স্বর্গ বানিয়ে ফেলেছে—এ কথা বিশ্বাস করতে হলে যুক্তিকে ছুটি দিতে হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে বিচার করতে হলে আবেগ নয়, তথ্য দেখতে হবে। ভারতের আইআইটি, আইআইএসসি, আইআইএম, শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের কিছু ক্ষেত্রভিত্তিক অগ্রগতি, নেপাল-ভুটানের বিশেষায়িত প্রোগ্রাম—সবকিছুর সঙ্গে তুলনা করতে হবে। শুধু “মুসলিম দেশ”, “ঐতিহাসিক সম্পর্ক”, “ভাই-ভাই” ধরনের স্লোগান দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান মাপা যায় না।

ডিগ্রির ওপর স্লোগান ছাপা থাকে না; থাকে প্রতিষ্ঠানের মান, গবেষণার শক্তি আর চাকরির বাজারে তার গ্রহণযোগ্যতা।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশি তরুণ কেন পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা নিতে যাবে? যদি কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত প্রোগ্রাম থাকে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকে, গবেষণার সুযোগ থাকে, নিরাপদ ক্যাম্পাস থাকে, শক্তিশালী স্কলারশিপ থাকে এবং ডিগ্রির বাস্তব বাজারমূল্য থাকে, তাহলে অবশ্যই তা বিবেচনা করা যেতে পারে।

জ্ঞান কোনো সীমান্ত মানে না। পাকিস্তানের ভালো শিক্ষক থেকে শেখা যাবে না—এমন কথা কেউ বলছে না। একাডেমিক সহযোগিতা, গবেষণা বিনিময়, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক—এসবও দরকারি হতে পারে।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন উচ্চশিক্ষার আলোচনাকে তথ্যের বদলে আবেগ দিয়ে চালানো হয়। যদি বলা হয়, “পাকিস্তান আমাদের আপন, আমাদের ভাই”, “ওখানেই আসল সম্পর্ক”, “ওদিকে তাকাও”—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। উচ্চশিক্ষা কোনো রাজনৈতিক পুনর্বাসন প্রকল্প নয়।

তরুণদের ভবিষ্যৎ কোনো মতাদর্শিক পরীক্ষাগারও নয়। একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেয় নিজের ভবিষ্যৎ, দক্ষতা, চিন্তা ও কর্মজীবনের জন্য; কোনো রাজনৈতিক স্মৃতি পুনরুদ্ধারের জন্য নয়।

বাংলাদেশের নিজের উচ্চশিক্ষাতেও সমস্যা আছে। গবেষণার ঘাটতি আছে, রাজনীতি আছে, মানের বৈষম্য আছে, আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে দুর্বলতা আছে। কিন্তু নিজের ঘরে ধুলো আছে বলে পাশের ভাঙা বারান্দাকে প্রাসাদ বলাটা ঠিক হবে না।

বরং বাংলাদেশের তরুণদের র‌্যাংকিং দেখে, প্রোগ্রাম অ্যাক্রেডিটেশন দেখে, শিক্ষক-গবেষণা দেখে, ল্যাব দেখে, নিরাপত্তা দেখে, ডিগ্রির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দেখে, চাকরির বাজারে তার মূল্য দেখে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র বেছে নেওয়া উচিত। শুধু রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে ভবিষ্যতের টিকিট কাটলে সেই ট্রেন ভুল প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে দিতে পারে।

আরও বড় কথা, পাকিস্তানের তরুণরাই উচ্চশিক্ষা ও উন্নত ক্যারিয়ারের জন্য বিপুল সংখ্যায় বিদেশমুখী। কেউ যায় যুক্তরাজ্যে, কেউ কানাডায়, কেউ অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ মধ্যপ্রাচ্যে, কেউ ইউরোপে। এর মধ্যে স্বাভাবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, আবার নিজ দেশের সীমাবদ্ধতা থেকেও পালানোর চেষ্টা আছে।

যদি কোনো দেশ নিজের তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে না পারে, তাহলে বাংলাদেশি তরুণদের সেখানে পাঠানোর আগে দশবার ভাবা দরকার। যে ঘরে নিজের ছেলেই থাকতে চায় না, সেখানে পাশের বাড়ির ছেলেকে পাঠানোর আগে অন্তত ঘরের ছাদটা দেখা উচিত।

পাকিস্তান আমাদের ইতিহাসের একটি কঠিন অধ্যায়। সেই ইতিহাসকে ঘৃণা দিয়ে নয়, জ্ঞান দিয়ে পড়তে হবে। পাকিস্তানের ভালো দিক স্বীকার করতে কোনো সংকোচ নেই। কিন্তু ইতিহাসের অমীমাংসিত আবেগ দিয়ে ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বন্ধুত্ব হোক, কূটনৈতিক সম্পর্ক হোক, সাংস্কৃতিক বিনিময় হোক—সবই চলুক। কিন্তু তরুণদের উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত তথ্য, মান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের যৌক্তিক সম্ভাবনার ওপর দাঁড়াক।

বাংলাদেশের তরুণদের সামনে পৃথিবী খোলা। তারা কেন সংকুচিত দরজা দিয়ে যাবে, যখন বিস্তৃত পথ আছে? উচ্চশিক্ষা কোনো আবেগের মিছিল নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের কঠিন কাজ। সেখানে ভুল দেশ, ভুল প্রতিষ্ঠান, ভুল উদ্দেশ্য—সব মিলিয়ে একটি প্রজন্মের সময় নষ্ট হতে পারে।

তাই প্রশ্নটি আবারও করা দরকার: কেন পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা? যদি উত্তর হয় মানসম্মত নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম, শক্তিশালী গবেষণা, নিরাপদ ক্যাম্পাস, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ভালো ক্যারিয়ার, তাহলে তথ্য দিন, তুলনা দিন, প্রমাণ দিন।

আর যদি উত্তর হয় আবেগ, অতীত, ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক নস্টালজিয়া, তাহলে বিনীতভাবে বলতে হয়, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই খেলা বন্ধ হোক। বাংলাদেশের তরুণের দরকার এমন দরজা, যা খুললে পৃথিবী বড় হয়। এমন জানালা নয়, যা খুললেই ইতিহাসের পুরোনো ধুলো চোখে ঢুকে পড়ে।

উচ্চশিক্ষা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ

🕒 প্রকাশ: ০১:২২ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি

🕒 প্রকাশ: ০১:১০ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান

🕒 প্রকাশ: ০১:০০ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের

🕒 প্রকাশ: ১১:৪৯ অপরাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ

🕒 প্রকাশ: ১১:৪১ অপরাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250