ফাইল ছবি
আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বর্তমান সরকারও অতীতের মতো জনরোষের মুখে পড়তে পারে। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। সম্প্রতি চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (ডিএফপি) সংঘটিত হামলার প্রতিবাদে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শহিদুল আলম সরকারের উদ্দেশে হুমকি দিয়ে বলেন, জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে একটি সরকারকে ক্ষমতায় বসায়, তা পূরণে ব্যর্থ হলে সেই সরকারের প্রতি আস্থা টিকে থাকে না।
তিনি বলেন, “আপনারা ভিন্ন কথা বলেছেন বলেই জনগণ আপনাদের ভোট দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হলে তার পরিণতি ভালো হবে না।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে একটি শক্তিশালী সরকারকেও জনগণ সরিয়ে দিতে পেরেছে—এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বর্তমান সরকারকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি শহিদুল আলম; তিনি সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকেও অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে আখ্যা দেন। তার মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা ছোটখাটো ঘটনা নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
তিনি বলেন, “সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে শিল্পীদের ওপর আক্রমণ হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।”
এই ঘটনায় তিনি পরিকল্পিত হামলার ইঙ্গিত দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি হঠাৎ করে ঘটেনি; বরং পূর্বপরিকল্পিতভাবে কিছু লোককে এনে এই হামলা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে একটি সরকারি দপ্তরের মহাপরিচালকের কক্ষের ভেতরে এমন ঘটনা ঘটাকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখেন।
হামলার প্রেক্ষাপটে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ এভাবে উধাও হয়ে যায়।
তার মতে, আইন অনুযায়ী এমন ঘটনার ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ হারিয়ে গেলে তার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু আমরা তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না, যা উদ্বেগজনক।”
শহিদুল আলম আরও বলেন, এই ঘটনা কেবল কয়েকজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি বৃহত্তর পরিসরে শিল্পী সমাজ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ গড়ে তোলা জরুরি।
উল্লেখ্য, গত ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ‘মায়ের ডাক’-এর অন্যতম সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী মুশফিকুর রহমান জোহান, চলচ্চিত্র নির্মাতা মো. গোলাপ শাহ, আব্দুর রহমান, রিয়াদুল হাসান, নাফিস আমিন ও মাবুব হোসেন তাঁদের নির্মিত তথ্যচিত্রের বকেয়া বিল আনতে সেখানে যান। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ডিএফপির মহাপরিচালকের কক্ষে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডিএফপির চিত্রগ্রাহক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে বহিরাগত কিছু ব্যক্তি, যাদের মধ্যে স্থানীয় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও ছিলেন, এই হামলায় অংশ নেয়। হামলায় অন্তত চারজন আহত হন, যাদের মধ্যে মুশফিকুর রহমান জোহানও রয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে চলচ্চিত্র নির্মাতা মো. গোলাপ শাহ বলেন, তারা মূলত তাদের কাজের পারিশ্রমিক বা বকেয়া বিল নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে এক কর্মকর্তার অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বহিরাগত লোকজন এনে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।
তিনি বলেন, “হামলার সময় আমার মাথা ফেটে যায় এবং অন্য সহকর্মীরাও গুরুতর আহত হন।”
সংবাদ সম্মেলনে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়, যা উপস্থাপন করেন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী মোশফিকুর রহমান। বক্তব্যে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক কর্মকর্তা বিল পরিশোধে বাধা দেন এবং পরে বহিরাগতদের মাধ্যমে হামলা সংগঠিত করেন। আরও অভিযোগ করা হয়, ঘটনার পর পুলিশ এলেও সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হয়নি। তাদের দাবি, প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন থেকে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করা ও আইনের আওতায় আনা, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ প্রদান, সংস্কৃতিকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থায়নে চলচ্চিত্র নির্মাণে আর্থিক অনিয়ম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন, শিল্পী রীতু সাত্তার এবং চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জাহিন ফারুক আমিন। তারা সবাই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
সামগ্রিকভাবে, এই সংবাদ সম্মেলন থেকে যে বার্তা উঠে এসেছে তা হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিরাপত্তাহীনতা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হুমকি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ। শহিদুল আলমের বক্তব্যে সেই উদ্বেগই প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে তিনি একদিকে সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় সম্মিলিত প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন।
খবরটি শেয়ার করুন