ফাইল ছবি
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম পালন করবেন—শেখ হাসিনার এমন বক্তব্য প্রকাশের পর দলের ভেতরে নতুন করে নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে এসেছে। এ সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের একটি অংশ সন্তুষ্ট হলেও অন্য একটি অংশ এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে জাহাঙ্গীর কবির নানকের অনুসারী হিসেবে পরিচিত নেতারা শেখ সেলিমকে সামনে আনার বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এই অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গতকাল সোমবার রাতে কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই ও সাবেক সংসদ সদস্য পলাতক শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকটি মূলত জাহাঙ্গীর কবির নানকপন্থী নেতাদের উদ্যোগেই আয়োজন করা হয়। সেখানে শেখ সেলিমকে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানানোর পাশাপাশি নানককে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরার বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন নাসিম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হাসান রিপনসহ আট থেকে দশজন নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের একজন নেতা সুখবর ডটকমকে বলেন, শেখ হেলালের সামনে একজন কেন্দ্রীয় নেতা শেখ সেলিমকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের অস্বস্তির কথা তুলে ধরেন। এরপর অন্য নেতারাও একই বিষয়ে নিজেদের আপত্তি জানান। তাদের বক্তব্যে শেখ সেলিমের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অনুপস্থিতি, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
ওই নেতা বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, সাংগঠনিকভাবে শেখ সেলিমের কারণে আওয়ামী লীগ অতীতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দলের বিভিন্ন স্তরে বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রবেশের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। গত ১৫ বছরে তদবির ছাড়া দলীয় কাজে শেখ সেলিমকে পাওয়া যেত না—এমন অভিযোগও একজন নেতা বৈঠকে তুলে ধরেন।
শেখ হেলালের উদ্দেশে ওই নেতা বলেন, শেখ সেলিম দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেননি বলে তাদের ধারণা। এমন অবস্থায় তাকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হলে দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী সেটি মেনে নেবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি শেখ হেলালকে শেখ হাসিনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে শেখ সেলিম ছাড়া দলের আর কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়ার মতো নেই কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন।
তবে বৈঠকে উপস্থিত আরেক নেতা বলেন, শুধু শেখ সেলিমের বিরোধিতা করাই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল না। নানককে আওয়ামী লীগের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে তুলে ধরাও ছিল আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য। তার ভাষ্য, শেখ সেলিম দলের জ্যেষ্ঠতম প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সাংগঠনিক যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর কবির নানক ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে এসে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই বিষয়গুলো শেখ হেলালের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা।
বৈঠকের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নেতারা তাদের বক্তব্য শেখ হেলালের কাছে তুলে ধরেন। পরে শেখ হেলাল বিষয়গুলো শেখ হাসিনার কাছে জানানোর এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করার আশ্বাস দেন। ফলে সোমবার রাতের ওই বৈঠককে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে শেখ সেলিমের নেতৃত্ব নিয়ে প্রথম বড় ধরনের সংগঠিত আপত্তির প্রকাশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেউ কেউ।
এর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালের নির্বাহী সম্পাদক অমল সরকারকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিমের সভাপতির দায়িত্ব পালনের কথা জানান। দ্য ওয়ালের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘এখন শেখ সেলিম জ্যেষ্ঠতম প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।’
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন অবশ্য শেখ সেলিমকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে দলের ভেতরে কোনো বিভাজনের কথা বলতে চাননি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। শেখ হাসিনা দ্য ওয়ালকে মূলত সেই কথাই বলেছেন। বর্তমান কমিটিতে শেখ সেলিমই সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য বলে জানান তিনি।
২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে শেখ হাসিনা টানা দশমবারের মতো দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই কমিটিতে ওবায়দুল কাদের তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হন। তখন সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ দুই সদস্য ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও মতিয়া চৌধুরী। তারা দুজনই মারা গেছেন। এরপর জ্যেষ্ঠতার ক্রমে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের অবস্থান সবার আগে।
তবে সোমবারের বৈঠকে নানকপন্থী নেতাদের আলোচনার কারণে গঠনতান্ত্রিক জ্যেষ্ঠতার বাইরে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। দলের একটি অংশ মনে করছে, শুধু পদমর্যাদা বা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে দায়িত্ব নির্ধারণ করলে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা যথেষ্ট নাও হতে পারে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা এবং দলের অনেক নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করায় নেতৃত্বের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
শেখ সেলিম শেখ হাসিনার আপন ফুফাতো ভাই। তার মা শেখ আছিয়া বেগম ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বোন। অন্যদিকে শেখ হেলাল উদ্দিন বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসেরের ছেলে। ফলে শেখ হেলালও শেখ হাসিনার আপন চাচাতো ভাই। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রশ্নে পরিবারের এই দুই শাখার সদস্যদের ভূমিকা এখন দলীয় আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
শেখ সেলিমকে ঘিরে আপত্তির ক্ষেত্রে তার পরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়েও বৈঠকের বাইরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। শেখ সেলিমের বড় ছেলে শেখ ফজলে ফাহিমের সঙ্গে ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের মেয়ে ন্যান্সি জাহারার বিয়ে হয়েছে। ন্যান্সির ভাই ববি হাজ্জাজ বর্তমানে বিএনপি সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। শেখ সেলিমের ছোট ছেলে শেখ ফজলে নাঈমের সঙ্গে বিএনপি নেতা এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মেয়ে সারাহ হাসিন মাহমুদের বিয়ে হয়েছে।
তবে শেখ পরিবারের অন্য সদস্যদের বৈবাহিক সম্পর্কও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় রয়েছে। শেখ হেলাল উদ্দিনের মেয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির নেতা আন্দালিভ রহমান পার্থর বিয়ে হয়েছে। তিনি বর্তমানে বিএনপি সরকারের তথ্যমন্ত্রী। ফলে শুধু শেখ সেলিমের পরিবার নয়, শেখ পরিবারের বিভিন্ন শাখার সঙ্গে বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের পারিবারিক সম্পর্কও দলের নেতাদের আলোচনায় এসেছে।
অবশ্য আওয়ামী লীগের সবাই যে শেখ সেলিমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তা নয়। দলের একটি অংশ শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট। এই অংশের নেতাদের মধ্যে শেখ সেলিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে তার দুই ভাতিজা শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি ওমর ফারুক চৌধুরী এবং শেখ হাসিনার ফুফাতো বোনের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন ও মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের নাম রয়েছে।
এই অবস্থায় সোমবারের বৈঠকটি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের সমীকরণে বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে। কারণ, বৈঠকে অংশ নেওয়া নানকপন্থী নেতারা সরাসরি শেখ হেলালের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে তাঁদের বক্তব্য পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। অর্থাৎ শেখ সেলিমকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তটি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়, দলের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও তৈরি করেছে।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। তার অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। শেখ হাসিনা ওই রায়কে ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করে আসছেন। একই সঙ্গে তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। নিজের গ্রেপ্তার কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকির কথাও তিনি সেখানে স্বীকার করেছিলেন। এরপর আল জাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য গার্ডিয়ান ও জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তার দেশে ফেরার ঘোষণাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের আগে আওয়ামী লীগের ভেতরে নেতৃত্বের প্রশ্নটি তাই নতুন মাত্রা পেয়েছে। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা এবং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশ নিতে না পারার পরিস্থিতিতে দলটির সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমন সময়ে সভাপতির দায়িত্ব কে পালন করবেন—তা নিয়ে দলটির বিভিন্ন অংশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সোমবার রাতে শেখ হেলালের বাসায় নানকপন্থী নেতাদের বৈঠক সেই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকেই প্রকাশ্যে এনেছে। বৈঠকে শেখ সেলিমের বিরুদ্ধে সরাসরি আপত্তি তোলার পাশাপাশি নানকের সাংগঠনিক ভূমিকা ও গ্রহণযোগ্যতাকে সামনে আনার চেষ্টা হয়েছে। এখন শেখ হেলাল শেখ হাসিনার কাছে বৈঠকের বক্তব্য কীভাবে তুলে ধরেন এবং শেখ হাসিনা এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেন কি না, সেদিকেই নজর দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের।
খবরটি শেয়ার করুন