বুধবার, ৯ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগের বৈঠকে শেখ সেলিমকে নিয়ে ক্ষোভ

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১০:৩১ অপরাহ্ন, ৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম পালন করবেন—এমন বক্তব্যের পর দলটির একটি অংশে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েক জ্যেষ্ঠ নেতা এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের আপত্তি জানিয়েছেন। এ নিয়ে গতকাল সোমবার রাতে কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় বৈঠকও হয়েছে বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালের নির্বাহী সম্পাদক অমল সরকারকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিম দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। দ্য ওয়ালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘এখন শেখ সেলিম জ্যেষ্ঠতম প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।’

এই বক্তব্য প্রকাশের পরই আওয়ামী লীগের একটি অংশের নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। সোমবার রাতের বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন নাসিম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হাসান রিপনসহ আট থেকে দশজন নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

বৈঠকে উপস্থিত একজন আওয়ামী লীগ নেতা সুখবর ডটকমকে বলেন, একজন কেন্দ্রীয় নেতা শেখ হেলালের সামনে দলীয় সভাপতির সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের অস্বস্তির কথা তুলে ধরেন। পরে অন্য নেতারাও শেখ সেলিমের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অনুপস্থিতি এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বৈঠকে এক নেতা শেখ হেলালকে বলেন, সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে শেখ সেলিম ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন বলে তাদের ধারণা। দলের বিভিন্ন স্তরে তার কারণে বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রবেশের অভিযোগও তোলা হয়। ওই নেতা আরও বলেন, গত ১৫ বছরে তদবির ছাড়া দলীয় কাজে শেখ সেলিমকে পাওয়া যায়নি—এমন অভিযোগও নেতাদের মধ্যে রয়েছে।

শেখ হেলালের উদ্দেশে ওই নেতা আরও বলেন, শেখ সেলিম দলের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রাখেননি বলে তাদের দাবি; ফলে তাকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হলে তা দলের সবাই মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি শেখ হেলালকে শেখ হাসিনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, শেখ সেলিম ছাড়া দলে আর কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়ার মতো নেই কি না।

তবে বৈঠকে উপস্থিত আরেক নেতা বলেছেন, ওই জমায়েতের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জাহাঙ্গীর কবির নানককে দলের জন্য ‘বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে তুলে ধরা। তার ভাষ্য, শেখ সেলিম জ্যেষ্ঠ হলেও সাংগঠনিকভাবে নেতাকর্মীদের মধ্যে তার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিপরীতে নানক ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করেছেন—এই বিষয়টি শেখ হেলালের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরতে চেয়েছেন তারা।

সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে সবার বক্তব্য শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরার এবং বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করার আশ্বাস দিয়েছেন শেখ হেলাল।

শেখ সেলিম শেখ হাসিনার আপন ফুফাতো ভাই। তার মা শেখ আছিয়া বেগম ছিলেন শেখ হাসিনার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বোন। অন্যদিকে শেখ হেলাল উদ্দিন বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসেরের ছেলে। সে হিসাবে শেখ হেলালও শেখ হাসিনার আপন চাচাতো ভাই।

শেখ সেলিমকে ঘিরে আওয়ামী লীগের একটি অংশের সন্দেহ ও অবিশ্বাসের পেছনে তার পরিবারের রাজনৈতিক ও বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। শেখ সেলিমের বড় ছেলে শেখ ফজলে ফাহিমের সঙ্গে ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের মেয়ে ন্যান্সি জাহারার বিয়ে হয়েছে। ন্যান্সির ভাই ববি হাজ্জাজ বর্তমানে বিএনপি সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। শেখ সেলিমের ছোট ছেলে শেখ ফজলে নাঈমের সঙ্গে বিএনপি নেতা এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মেয়ে সারাহ হাসিন মাহমুদের বিয়ে হয়েছে।

শুধু শেখ সেলিমের পরিবারের সম্পর্ক নয়, শেখ পরিবারের অন্য সদস্যদের বৈবাহিক সম্পর্কও এখন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় আসছে। শেখ হেলাল উদ্দিনের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির নেতা আন্দালিভ রহমান পার্থর। তিনি বর্তমানে বিএনপি সরকারের তথ্যমন্ত্রী।

তবে শেখ সেলিমকে নিয়ে আওয়ামী লীগের সবাই যে অসন্তুষ্ট, তা নয়। দলের আরেকটি অংশ শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য। এই অংশের নেতাদের মধ্যে শেখ সেলিমের বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন শেখ সেলিমের দুই ভাতিজা শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি ওমর ফারুক চৌধুরী এবং শেখ হাসিনার ফুফাতো বোনের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন ও মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন অবশ্য শেখ হাসিনার উত্তরসূরি নির্বাচন বা শেখ পরিবারের আত্মীয়দের মধ্যে বিভাজন নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। শেখ হাসিনা দ্য ওয়ালকে সেই কথাই বলেছেন। এস এম কামালের ভাষায়, বর্তমান কমিটিতে শেখ সেলিমই সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য।

২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে ৮১ সদস্যের কমিটিতে টানা দশমবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। ওই সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সে সময়কার সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ দুই সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও মতিয়া চৌধুরী ইতিমধ্যে মারা গেছেন। এরপর জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ, পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, কামরুল ইসলাম, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, জেবুন্নেছা হক, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ও সিমিন হোসেন রিমি।

এই নেতাদের মধ্যে কাজী জাফর উল্লাহ, মুহাম্মদ ফারুক খান ও শাজাহান খান কারাগারে আছেন। শেখ সেলিমের পাশাপাশি ভারতে অবস্থান করছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও জাহাঙ্গীর কবির নানক। আব্দুর রহমান আছেন যুক্তরাজ্যে।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা হারানোর পর ভারতে অবস্থান করছেন। তার অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়। শেখ হাসিনা ওই বিচারকে ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করে আসছেন। একই সঙ্গে তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া জুলাইয়ের সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। নিজের গ্রেপ্তার বা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকির কথাও তিনি স্বীকার করেছিলেন।

আগস্টে আল জাজিরা ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও তার ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই বছর ভারতে নির্বাসনে থাকার পর মৃত্যুদণ্ডের মুখেও দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তিনি ভারতে অবস্থান করছেন এবং দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।

দ্য গার্ডিয়ানও আগস্টে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, তার দেশে ফেরার ঘোষণা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপরও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনেও শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার অঙ্গীকারের কথা উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডের মুখেও তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছা জানিয়েছেন।

এদিকে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শেখ সেলিমকে সামনে আনার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা চলছে। কারণ, দলটির কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। গার্ডিয়ান ফেব্রুয়ারিতে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

ফলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের সম্ভাব্য দেশে ফেরার আগে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। শেখ সেলিমকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে দলের একটি অংশের আপত্তি এবং অন্য অংশের সমর্থন—দুই বিপরীত অবস্থানই এখন দলটির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে কে দলকে নেতৃত্ব দেবেন, তা শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক বাস্তবতায় এটি দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

আওয়ামী লীগ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250