বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে। অতীতের অপূর্ণতা, বর্তমানের নীতিগত জটিলতা এবং ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কা যেন একে অপরকে পেছনে ঠেলছে। নির্বাচন ঘিরে দ্বিধা, সংবিধানের ধারা নিয়ে ভিন্নমত, এবং নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্ন জমেছে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্র যেন এক দিশাহীন ভাসমান নৌকা—যার গন্তব্য অস্পষ্ট।
এই রাজনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে চ্যানেল আই-এর জনপ্রিয় টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’র আলোচনায় উঠে আসে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সংবিধানিক কাঠামো, ১০৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক, অন্তর্বর্তী সরকারের আইনগত ভিত্তি, বিরোধী দলগুলোর কৌশল এবং নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান।
গত শনিবার (৩রা আগস্ট) প্রচারিত এই পর্বে অনুষ্ঠানটির নিয়মিত সঞ্চালক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের পরিচালনায় আলোচক হিসেবে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ‘দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট’ সম্পাদক এম এ আজিজ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও জি-নাইন এর সাধারণ সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত।
তাদের বিশ্লেষণে উঠে আসে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ, নির্বাচন ঘিরে সময়সূচি ও প্রস্তুতির বাস্তবতা, এবং ড. ইউনূসকে ঘিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক ইঙ্গিত।
আজ মঙ্গলবার (৫ই আগস্ট) দুপুরে এই প্রতিবেদন লেখা পযর্ন্ত ‘তৃতীয় মাত্রা’র ইউটিউব চ্যানেলে আপলোকৃত ওই ভিডিওটি দেখেছেন ৫ হাজার ৬২২ জন দর্শক।
সরকার পরিচালনায় ১০৬ অনুচ্ছেদ ও বৈধতার প্রশ্ন
এম এ আজিজ বলেন, বর্তমান সরকার সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করলেও তার বাস্তব প্রয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন—এমনটি বলা হলেও তার লিখিত কোনো প্রমাণ জনগণের সামনে আসেনি।
তার বক্তব্যে উঠে আসে, ‘যে অনুচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে স্বাক্ষরদাতাদের সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই। অনেকেই তখন আশ্রয় নিয়েছিলেন সেনানিবাসে। প্রধান বিচারপতির নামসহ অনেকে থাকলেও এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কোথায়?’
তিনি অভিযোগ করেন, এই সরকার জোড়াতালি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, এবং এই অবস্থায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ নেই।
ড. ইউনূসের বিদেশমুখী অবস্থান ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
দুই আলোচকই ড. ইউনূসের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সরব হন।
এম এ আজিজ দাবি করেন, ‘ড. ইউনূস দেশের তিনটি পত্রিকায় কথা বললেও, বাকি সব বক্তব্য বিদেশি গণমাধ্যমে দিয়েছেন। তিনি দেশের জনগণের মুখোমুখি হতে চান না।’
তার অভিযোগ, গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণফোনের বিপুল সুদের টাকা মওকুফ করা হয়েছে, এমনকি ড. ইউনূসের নোবেল পুরস্কার নিয়েও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত বলেন, '‘ড. ইউনূস এখন আর শুধু সামাজিক ব্যবসার মানুষ নন, তার মধ্যে একধরনের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে। মানুষ তার ঠোঁটের নিচের ‘হাসিও’ চিনে ফেলেছে।’'
বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব
টকশোতে আলোচনায় উঠে আসে, বিএনপি এবং এনসিপি যদি জোট গঠন করে নির্বাচনমুখী হয়, তবে আসন ভাগাভাগি এখনো স্পষ্ট নয়।
ডা. সায়ন্ত বলেন, ‘এনসিপি যেসব আসনে আগ্রহী, সেখানে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থীরা রয়েছেন। এটা এখনো সমাধান হয়নি।’ এই বিষয়ে সমঝোতা না হলে জোট কার্যকরভাবে মাঠে নামতে পারবে না বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন দিতে সরকার বাধ্য হবে
ডা. সাখাওয়াত হোসেন আশাবাদ প্রকাশ করেন, ‘বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ দাবি করছে। সেই চাপেই সরকার ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে।’
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা, বিদেশি চাপ, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বর্তমান মনোভাব নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে যাবে।
সেই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বিএনপি যখন আন্দোলনে নামবে, তখন কিছু ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী সেটিকে সহিংসতায় পরিণত করতে চাইবে। এতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
জাতীয় ও জুলাই সনদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে সঞ্চালক জিল্লুর রহমান প্রশ্ন তোলেন—জাতীয় ও জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ কী?
জবাবে এম এ আজিজ বলেন, ‘১৯৫২, ১৯৭১ ও ১৯৯০—এই তিনটি অধ্যায় ছাড়া জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়। শুধু ২০২৪ নিয়ে থাকলে চলবে না। এর মানে হবে অতীতকে মুছে দেওয়া, যা জাতিকে বিভক্ত করবে।’ তিনি মনে করেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের মতো একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে দেশের গণতন্ত্র শক্ত হবে।
‘তৃতীয় মাত্রা’ অনুষ্ঠানে উঠে আসা এই আলোচনাগুলো স্পষ্টভাবে দেখায়, দেশের রাজনীতি এখন তীব্র দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে জনগণ, রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে।
আলোচকদের মতে, একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই হতে পারে এই সংকটের একমাত্র রাজনৈতিক সমাধান।
খবরটি শেয়ার করুন