ছবি: সংগৃহীত
শায়লা শবনম
ঈদের ছুটির আনন্দে দেশজুড়ে যখন উৎসবের আমেজ, তখন রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বরে ঘটে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম নামে এক মা নিজের ঘরে মৃত্যুর পর সাত দিন বিছানাতেই পড়ে ছিলেন। ভাগ্যাহত ওই মায়ের মরদেহে পচন ধরেছে, পোকায় খেয়েছে। অথচ নিহত ওই নারীর সন্তানরা কেউ সমাজের প্রান্তিক মানুষ নন।
একজন যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক, মেয়ে ও জামাতাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু কেউ বলতে পারেননি, মা কবে মারা গেলেন! গত ৩১ মে রোববার ৯৯৯–এ প্রতিবেশীদের ফোন পেয়ে পুলিশ গিয়ে তার কংকালসার গলিত মরদেহ উদ্ধার করে।
একজন মায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমন মর্মান্তিক এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠেছে প্রতিবাদের ঝড়। প্রশ্ন উঠেছে— এ দায় কার? শুধু সন্তানদের? নাকি আমাদের সমাজ, পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রেরও?
ঘটনাটি নিছক একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি। যে মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে সন্তানদের মানুষ করেছেন, শিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন— শেষ বয়সে তার প্রাপ্তি হলো নিঃসঙ্গতা, অবহেলা এবং একাকী মৃত্যু!
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এটি প্রথম ঘটনা নয়। কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে এক বৃদ্ধ বাবার মরদেহ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, যিনি দীর্ঘদিন একা ছিলেন। আবার রাজধানীতেই এক বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর পর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশে খবর দিয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনায় প্রতিবারই সমাজে কিছুদিন লোকজন আলোচনা করে, আবেগ প্রকাশ করে, তারপর নতুন ঘটনার চাপে পুরনো ক্ষত ভুলে যায়।
কারণ, সমাজে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার চাপে আগের ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। বেশিরভাগ ঘটনা বিচারের ধুসর আলোও দেখতে পায় না। ফলে সমস্যার শিকড় থেকে যায় অক্ষত, আরও গভীরে প্রোথিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার যথার্থই বলেছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়; বরং সমাজের গভীর মূল্যবোধগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। তার মতে, আমরা সন্তানদের সফল মানুষ বানাতে ব্যস্ত, কিন্তু ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। আজকের সমাজে একজন মানুষের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে তার পদ-পদবি, আয়, ডিগ্রি ও সামাজিক অবস্থান দিয়ে। কিন্তু মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং পারিবারিক দায়বদ্ধতা শেখানোর ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ উভয়ই পিছিয়ে পড়ছে।
বাস্তবতা হলো, যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন মানুষকে ক্রমশ একা করে দিচ্ছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে কথা বলা, তাদের সময় দেওয়া, খোঁজ নেওয়া— এসব এখন অনেক পরিবারের কাছে অতিরিক্ত দায়িত্ব বলে মনে হয়। সন্তানদের বড় করার সময় আমরা তাদের শেখাচ্ছি প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ার এবং সাফল্যের ভাষা; কিন্তু শেখাচ্ছি না কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্পর্কের মূল্য।
দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার ৯ শতাংশেরও বেশি প্রবীণ। জনসংখ্যার বার্ধক্য দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, কমিউনিটি কেয়ার কিংবা মানসিক সহায়তা ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। অনেক প্রবীণ একা থাকেন, অনেকেই সন্তানদের অবহেলার শিকার হন। অথচ এসব ঘটনা খুব কমই আলোচনায় আসে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনিরা রহমান এই ঘটনাকে আরও গভীর সংকটের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এটি শুধু মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নয়, বরং একটি মানসিক স্বাস্থ্য সংকটেরও প্রতিফলন। কারণ একজন মানুষ যদি নিজের জন্মদাত্রী মায়ের প্রতিও ন্যূনতম সহমর্মিতা অনুভব না করেন, তবে সেখানে সামাজিকীকরণ ও মানসিক বিকাশের প্রশ্নও সামনে আসে।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা একের পর এক সহিংসতা, নির্মমতা ও সামাজিক ট্রমার মধ্যে বাস করছি। এসব ঘটনার কোনো নিরাময় বা সামাজিক প্রতিকার হচ্ছে না। ফলে বেশিরভাগ মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে এবং অন্যের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলছে। সমাজে সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে, সম্পর্কগুলো হয়ে উঠছে যান্ত্রিক।
মনিরা রহমান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ। এরও বড় অংশ ব্যয় হয় প্রাতিষ্ঠানিক খাতে। জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেই চলে। ফলে সামাজিক ও পারিবারিক সংকটের মানসিক দিকগুলোও অযত্নে থেকে যাচ্ছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশে কি আইন নেই?
আছে। ২০১৩ সালে প্রণীত ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ অনুযায়ী সন্তানদের জন্য বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। আইনে বলা হয়েছে, সন্তানদের বাবা-মায়ের খোঁজখবর নিতে হবে, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা এবং ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আইনের প্রয়োগ কোথায়?
আইনটি প্রণয়নের এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এর কার্যকর প্রয়োগের নজির খুবই কম। অধিকাংশ প্রবীণ বাবা-মা সন্তানদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় এবং মানসিক দুর্বলতার কারণে তারা নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। ফলে আইন বইয়ের পাতায় থাকলেও বাস্তবে তার প্রভাব খুব কম।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরপিবি'র সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের মতে, একজন বৃদ্ধা মা ঘরে একা মারা যাওয়ার পর দিনের পর দিন তার লাশ পড়ে থাকা এবং সন্তানেরা খোঁজ না নেওয়ার ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, বরং সমাজের গভীর মানবিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
তিনি মনে করেন, সামাজিক সম্প্রীতি ও পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে রাষ্ট্রেরও দায় রয়েছে। পরিবার ও সমাজের বন্ধনকে শক্তিশালী রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অস্থিরতা, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে মানুষের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক সংবেদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পরিবারে বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধও ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
মনজিল মোরসেদ বলেন, আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না; অপরাধ ও দায়িত্বহীনতা কমাতে প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার। বাংলাদেশে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি ভীতি ও আস্থা— দুটিই কমিয়ে দিয়েছে। একটি ঘটনার বিচার যদি ১৫ বা ২০ বছর পর হয়, তাহলে তা সমাজের জন্য কার্যকর শিক্ষা হয়ে ওঠে না। কিন্তু অপরাধ বা অবহেলার ঘটনার দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।
তার মতে, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সামাজিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; অন্যথায় এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
আসলে একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার উঁচু ভবন, বড় রাস্তা কিংবা উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একটি সমাজ কতটা মানবিক, কতটা দায়িত্বশীল এবং কতটা সহমর্মী—সেটিই তার প্রকৃত মানদণ্ড।
মিরপুরের নূরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে সেই কঠিন প্রশ্নই তুলে ধরেছে। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে বাবা-মা সন্তানদের জন্য জীবন উৎসর্গ করবেন, কিন্তু বার্ধক্যে এসে তাদের অস্তিত্বই অদৃশ্য হয়ে যাবে? আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা পেশাগতভাবে সফল, কিন্তু মানবিকভাবে দেউলিয়া?
আজ নূরজাহান বেগমের মৃত্যু নিয়ে আমরা ক্ষুব্ধ। কিন্তু যদি পরিবারে মানবিক শিক্ষা, সমাজে মূল্যবোধের চর্চা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে আগামী দিনে আরও অনেক নূরজাহান বেগমের করুণ পরিণতির খবর আমাদের শুনতে হবে।
এই দায় শুধু একজন সন্তানের নয়। এই দায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র— সবার। আর এখনই যদি আমরা এই সংকটের মুখোমুখি না হই, তাহলে একদিন হয়তো আমাদের নিজেদেরও একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হবে— আমাদের খোঁজ নেবে কে?
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন