ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের ওপর বড় ধরনের হামলা হলে পাকিস্তান কি সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে? মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পর প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আবার তীব্র হওয়ার পর এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। চুক্তির অন্যতম মূল কথা হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে এর অর্থ যে হামলার পর সঙ্গে সঙ্গে অন্য দুই দেশ সেনা পাঠিয়ে যুদ্ধে নামবে—এমন সরাসরি ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে দেওয়া হয়নি।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অবশ্য চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের প্রশ্ন সামনে এনেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর হুতিরা সৌদি রাজধানী রিয়াদসহ কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। সৌদি সামরিক বাহিনীও কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও হামলা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। রিয়াদের বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও ধোঁয়া দেখা যায়। বিষয়টি রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব দাবি করে, মক্কার কাছাকাছি হুতিদের একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ মক্কার নিরাপত্তাকে ‘লাল রেখা’ হিসেবে উল্লেখ করে। হুতিরা অবশ্য মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান জানিয়েছিল, হুতিদের হামলার জবাবে মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে তখন পর্যন্ত আলোচনা হয়নি। তবে প্রয়োজন হলে চুক্তির অধীনে দায়িত্ব পালনের কথাও বলা হয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে পাকিস্তানের এই অবস্থান তুলে ধরা হয়।
১৮ সেপ্টেম্বর আল জাজিরা জানায়, পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষার প্রতি পূর্ণ অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবে এর মধ্যেও সরাসরি ইয়েমেনে সেনা পাঠানোর ঘোষণা আসেনি।
তুরস্কের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, সৌদি আরবের সামরিক প্রয়োজন দেখা দিলে তার দেশ মক্কা চুক্তির আওতায় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। রয়টার্স জানিয়েছে, তুরস্ক সামরিক ও কারিগরি সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখছে। তবে এটিও সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার সমান নয়।
পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি সহজ নয়। সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারও। ফলে রিয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে ইসলামাবাদের ওপর রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানেরও দীর্ঘ সীমান্ত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। হুতিরা ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফলে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে নামলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
গার্ডিয়ান-এর ১৯ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তির কারণে পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবেদনে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণেও সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনার পাশাপাশি অন্য ধরনের সামরিক সহায়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। পাকিস্তানের পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের পরিচালক মুহাম্মদ আমির রানা গার্ডিয়ান-কে বলেছেন, পাকিস্তান ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযানে জড়ানো এড়িয়ে চলতে পারে। তার বিশ্লেষণে সৌদি আরবকে সামরিক সহযোগিতা দেওয়া এবং ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করা—দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখার ইঙ্গিত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও পাকিস্তানের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার পথে যায়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা হুতিদের সঙ্গে যোগাযোগও করেছেন। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তার বড় অংশ আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে পারে।
এদিকে হুতিরা সতর্ক করেছে, পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের পক্ষে ইয়েমেনে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করলে তারা জোরালো জবাব দেবে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ২০ সেপ্টেম্বর হুতিদের এই হুমকির খবর প্রকাশ করেছে।
এ অবস্থায় পাকিস্তানের সামনে কয়েকটি পথ রয়েছে। সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হতে পারে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে সহায়তা করা যেতে পারে। সামরিক প্রশিক্ষণ বা সরঞ্জাম দেওয়া হতে পারে। সৌদি ভূখণ্ডে পাকিস্তানি সেনা ও বিমান আগে থেকেই থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আগের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় পাকিস্তানি সেনা ও সামরিক বিমান সৌদি আরবের ঘাঁটিতে মোতায়েন রয়েছে।
তবে ইয়েমেনে সরাসরি স্থলযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা পাঠানো হলে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হবে। এতে পাকিস্তান শুধু হুতিদের সঙ্গে নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়তে পারে। দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই মক্কা চুক্তি পাকিস্তানের জন্য একটি বড় কৌশলগত অঙ্গীকার তৈরি করলেও সরাসরি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য নেই। বরং ইসলামাবাদ সৌদি আরবের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, একই সঙ্গে সামরিক হস্তক্ষেপের মাত্রা নিয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান যুদ্ধে জড়াবে কি না, তা নির্ভর করতে পারে সৌদি আরবের ওপর হামলার মাত্রা, রিয়াদের আনুষ্ঠানিক সামরিক অনুরোধ এবং ইয়েমেনের সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয় তার ওপর। মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন সেই বাস্তব পরিস্থিতিতেই।
খবরটি শেয়ার করুন