বুধবার, ২৬শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কারাগারে মৃত্যু, দীর্ঘ আটক: এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের যেসব নেতার নাম *** কারাগারে হার্ট অ্যাটাক হলেও তখন জামিন পাননি খায়রুল হক *** বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা *** এই অল্প সময়ে বেশি কিছু আশা করা ঠিক হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** হরমুজে ‘অস্থায়ী নৌপথ’ চালু করছে ইরান–ওমান, আছে শর্তও *** আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) *** তিন সাংবাদিককে মারধরের পর বিএনপি নেতা বললেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু’ *** সরকার চায় শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থাকুন, আল জাজিরাকে বিশেষজ্ঞরা *** মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন কেন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে *** ফরিদপুরে অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবুর বাড়িতে চুরি

কারাগারে হার্ট অ্যাটাক হলেও তখন জামিন পাননি খায়রুল হক

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৫:৪৬ অপরাহ্ন, ২৬শে আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

এক বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর গত ১৯ আগস্ট জামিনে মুক্তি পেয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তবে কারাগারে থাকার পুরো সময়টায় তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, জামিনের আবেদন নাকচ এবং উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনা ঘটেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায় তার একবার হার্ট অ্যাটাকও হয়েছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে। তবু তার জামিন পেতে সময় লেগেছে এক বছরের বেশি।

সাবেক এই প্রধান বিচারপতির মামলার ধারাবাহিকতাকে দীর্ঘ মেয়াদে বিচার-পূর্ব আটক রাখার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। গত ২৩ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংগঠনটি দেশের রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘদিনের বিচার-পূর্ব আটক বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। ‘বাংলাদেশ: রাজনৈতিক বিরোধীদের অনির্দিষ্টকাল বিচার-পূর্ব আটক বন্ধ করুন’ শিরোনামের এইচআরডব্লিউর ওই প্রতিবেদনের উপশিরোনাম ছিল ‘কারাগারে মৃত্যুর তদন্ত করুন, নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার নীতি মানুন, ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করুন’।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের কর্মকর্তা, কর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের অনেকেই এখনো কোনো অপরাধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত না হয়েই কারাগারে আছেন। সংগঠনটির বক্তব্য, সাবেক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও কারও বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু অনেককে বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে দৃশ্যত কোনো প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বয়স্ক ও অসুস্থ বন্দীদের জামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগও করেছে তাদের পরিবার ও আইনজীবীরা।

এই প্রেক্ষাপটেই ৮২ বছর বয়সী সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিষয়টি প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে এইচআরডব্লিউ। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পরবর্তী তিন মাসে দুর্নীতিসহ আরও চারটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এসব মামলায় নিম্ন আদালত তার জামিনের আবেদন নাকচ করেন। পরিবারের সদস্যরা এইচআরডব্লিউকে জানান, তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং কারাগারে থাকা অবস্থায় একবার হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন। এরপরও খায়রুল হকের জামিন পাওয়ার পথ সহজ হয়নি।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আদালত তার জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ১০ মার্চ, সর্বশেষ মামলায় আদালত জামিন দেওয়ার এক দিন আগে পুলিশ তাকে আরও দুটি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর উদ্যোগ নেয়। এর ফলে আদালতের দেওয়া জামিন কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। নতুন দুটি মামলাতেও নিম্ন আদালত তার জামিনের আবেদন নাকচ করেন। পরে ১২ মে উচ্চ আদালত তাকে জামিন দেন।

কিন্তু সেখানেও শেষ হয়নি বিষয়টি। খায়রুল হক কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই পুলিশ তার বিরুদ্ধে আরও একটি হত্যা মামলা করে। এই মামলায় যে অভিযোগ আনা হয়, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে এইচআরডব্লিউ। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ তাকে একই সময়ে আরেকটি হত্যা মামলার ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার অভিযোগ করে। অথচ দুটি ঘটনাস্থলের মধ্যে দূরত্ব ১০ কিলোমিটারের বেশি।

এরপর আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। উচ্চ আদালত খায়রুল হককে জামিন দেওয়ার পর পুলিশ তৃতীয়বারের মতো তার বিরুদ্ধে নতুন মামলা করে। এর মধ্য দিয়ে উচ্চ আদালতের জামিনের আদেশ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই আদেশে পুলিশকে বলা হয়েছিল, নির্দিষ্ট কোনো মামলা না থাকলে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপের পর ১৯ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এই পুরো সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়নি বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিচার-পূর্ব আটক রাখার যে চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এইচআরডব্লিউ, খায়রুল হকের ঘটনা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সংগঠনটি জানিয়েছে, এমন আরও অনেক বন্দীর আইনজীবীরা এখন তাদের মক্কেলদের জামিনের আবেদন না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ, জামিন হয়ে গেলে পুলিশ নতুন মামলা দিয়ে আবার তাদের কারাগারে পাঠাতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

খায়রুল হক ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। পরের বছরের ১৭ মে তিনি অবসরে যান। তার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। ওই রায়ের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে খায়রুল হককে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়।

২০২৫ সালের ২৪ জুলাই ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর তাকে প্রথমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে একে একে আরও মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মোট নয়টি মামলা হয়। এসব মামলায় এক বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান।

কারাগার থেকে মুক্তির আগে তার বিরুদ্ধে থাকা সর্বশেষ মামলাটিও জামিনের আওতায় আসে। ১০ আগস্ট বনানী থানায় করা একটি মামলায় উচ্চ আদালত তাকে জামিন দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওই জামিনের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করলেও ১৭ আগস্ট আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ‘নো অর্ডার’ দেন। এর ফলে ওই মামলায় তার জামিন বহাল থাকে এবং মুক্তির পথ খুলে যায়। ১৯ আগস্ট বিকেলে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান।

খায়রুল হকের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি এইচআরডব্লিউ দেশের কারাগারে থাকা আরও কয়েকজন বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তির পরিস্থিতির কথা বলেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগপন্থী পদধারী কারাগারে মারা গেছেন; তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়নি। রমেশ চন্দ্র সেন ও এস এম জিয়াউল হক জিয়ার মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের কথা উল্লেখ করে এইচআরডব্লিউ বলেছে, বিচার-পূর্ব আটক কোনো মামলায় ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সেটি নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম হওয়া উচিত। প্রত্যেক বন্দীর আটক আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় কি না, তা পৃথকভাবে একজন বিচারক বা সমপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা করা উচিত। আটক ব্যক্তির দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে; তা না হলে তাকে মুক্তি দেওয়ার কথা। একই সঙ্গে নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার নীতি এবং ন্যায়বিচারের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেছেন, কোনো ব্যক্তিকে অভিযোগ গঠন করার আগেই কারাগারে রেখে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হলে বিচার-পূর্ব আটককে যে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করার কথা, তা আর মানা হয় না। সংগঠনটি বাংলাদেশের কারাগারে ঘটে যাওয়া সব মৃত্যুর স্বাধীন তদন্ত এবং অভিযোগ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে স্বেচ্ছাচারী আটক বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

খায়রুল হকের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপে কারামুক্তি হয়েছে। তবে তার এক বছরের বেশি সময়ের কারাবাস, অসুস্থতার মধ্যেও জামিন না পাওয়া এবং একের পর এক নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ধারাবাহিকতাই এখন এইচআরডব্লিউর উত্থাপিত বৃহত্তর প্রশ্নের কেন্দ্রে—বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে কতটা দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা যায় এবং আদালত জামিন দেওয়ার পরও নতুন মামলা করে সেই জামিন কার্যকর হতে না দিলে বিচারিক প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা কতটা অটুট থাকে।

এ বি এম খায়রুল হক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250