ফাইল ছবি
কারাগারে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের অন্তত ১০ নেতা মারা গেছেন—এমন তথ্য সামনে এনে তাদের কয়েকজনের নাম ও মৃত্যুর পরিস্থিতি উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক, সাবেক সংসদ সদস্য, কর্মকর্তা, কর্মী ও সমর্থকদের দীর্ঘ সময় বিচার শুরুর আগেই আটকে রাখার বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের অভিযোগ, অনেকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও কারও কারও ক্ষেত্রে অভিযোগের পক্ষে দৃশ্যমান প্রমাণ নেই; আবার অনেক প্রবীণ বন্দী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও জামিনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
২৩ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠনটি। ‘রাজনৈতিক বিরোধীদের অনির্দিষ্টকাল বিচারপূর্ব আটক বন্ধ করুন’ শিরোনামের প্রতিবেদনের উপশিরোনাম ছিল ‘কারাগারে মৃত্যু তদন্ত করুন, নির্দোষিতার পূর্বানুমান ও ন্যায্য বিচারের অধিকারকে সম্মান করুন’। প্রতিবেদনের শুরুতেই সংগঠনটি বলেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও অন্যদের দীর্ঘদিন বিচার শুরুর আগে আটক রাখার অবসানে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
এইচআরডব্লিউর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর পুলিশ আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক করে। তাদের মধ্যে শত শত মানুষ এখনো কোনো অপরাধে অভিযুক্ত না হয়েই কারাগারে আছেন বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। তবে একই প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ বলেছে, শেখ হাসিনা সরকারের কিছু কর্মকর্তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে অনেককে দৃশ্যমান প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই আওয়ামী লীগ ও দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কারাবন্দিত্ব এবং কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা সামনে এনেছে এইচআরডব্লিউ। সংগঠনটির তথ্যমতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের অন্তত ১০ জন পদধারী কারাগারে মারা গেছেন। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তালিকায় সরাসরি নাম এসেছে সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনের। ৮৫ বছর বয়সী এই আওয়ামী লীগ নেতা ২০২৪ সালের আগস্টে তিনটি হত্যা মামলা ও একটি বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হন। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কারাগারেই ছিলেন। চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়। তার পরিবারের অভিযোগের বরাত দিয়ে এইচআরডব্লিউ বলেছে, কারাগারে তাকে যথাযথ ওষুধ দেওয়া হয়নি এবং তার জামিনের আবেদনও নাকচ করা হয়েছিল।
কারাগারে মৃত্যুর আরেকটি ঘটনা হিসেবে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এস এম জিয়াউল হক জিয়ার নাম উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। ৬৫ বছর বয়সী জিয়াউল হককে ৬ জানুয়ারি আটক করা হয়েছিল। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটকের সময়ই তিনি অসুস্থ ছিলেন। পরে তার জামিন আবেদন নাকচ হয়। ১৪ এপ্রিল কারাগারে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও জামিনের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
কারাগারে মৃত্যুর পাশাপাশি দীর্ঘদিন আটক থাকা কয়েকজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদারের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। ৭৫ বছর বয়সী এই সাবেক সংসদ সদস্যকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২২ মাস ধরে আটক রেখেছে বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে। তার পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার পায়ে গ্যাংগ্রিন হয় এবং তিনটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়। পরে পড়ে গিয়ে তার কোমরের হাড়ও ভেঙে যায়। জুলাই মাসে তার জামিনের আবেদন নাকচ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেক প্রবীণ ব্যক্তি শাহরিয়ার কবিরের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। ৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এবং চলাফেরার জন্য হুইলচেয়ার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। অধিকারকর্মীরা তার মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে সাবেক সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর কথাও বলা হয়েছে। ৭১ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ২২ মাস ধরে কোনো অভিযোগ গঠন ছাড়াই আটক আছেন এবং তার গুরুতর হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর দীর্ঘ কারাবাসের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। ৮১ বছর বয়সী এই সাবেক উপদেষ্টাকে ২০২৪ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রথম আটক করে। এইচআরডব্লিউর হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ২২ মাস তিনি কোনো অভিযোগ গঠন ছাড়াই কারাগারে ছিলেন। এপ্রিল মাসে তিনি জামিন চাইলেও ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেননি এবং এক বছরের বেশি সময় আটক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’র কথাও উল্লেখ করেননি। বরং শুনানি দুই দফা পিছিয়ে সর্বশেষ আগস্টের শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে দীর্ঘ আটক ও জামিন না পাওয়ার একটি বিস্তৃত চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আটক ১৬০ জনের বেশি ব্যক্তির কাউকেই জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়নি। আইন অনুযায়ী অভিযোগ গঠন ছাড়া এক বছরের বেশি সময় আটক রাখা কেবল ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ অনুমোদিত হওয়ার কথা। কিন্তু সেই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি কী, তা প্রত্যেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনটি।
এইচআরডব্লিউ আরও বলেছে, নিম্ন আদালতগুলোতে জামিনের আবেদন ধারাবাহিকভাবে নাকচ হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত জামিন দিলেও নতুন মামলা দিয়ে সেই আদেশ কার্যকর হওয়ার পথ আটকে দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছে সংগঠনটি। যদিও খায়রুল হক আওয়ামী লীগের নেতা নন, তার বিষয়টি প্রতিবেদনে এসেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচারপূর্ব আটক ও জামিনের ক্ষেত্রে মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি উদাহরণ হিসেবে।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮২ বছর বয়সী খায়রুল হককে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই একজন বিক্ষোভকারীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী তিন মাসে দুর্নীতিসহ আরও কয়েকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং কারাগারে থাকাকালে একবার হৃদ্রোগে আক্রান্তও হন। উচ্চ আদালত জামিন দিলেও নতুন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মুক্তি আটকে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপের পর ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। পুরো সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন আটক থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনের আইনজীবী এখন তাদের মক্কেলদের জামিন চাইতে নিরুৎসাহিত করছেন। কারণ, জামিন পেলে পুলিশ নতুন মামলা দিয়ে তাদের আবার আটক করতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে আইনজীবীরা এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের পরিচালক এলাইন পিয়ারসন বলেছেন, এক সরকারের পর আরেক সরকারের সময় বিরোধীপক্ষের শত শত সদস্যকে প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। তার মতে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘদিন নির্বিচারে আটক রাখার অবসান ঘটানো।
কারাগারে মৃত্যুর বিষয়টিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। পিয়ারসনের বক্তব্য, অভিযোগ গঠনের আগেই প্রবীণ ব্যক্তিদের কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে যে বিচারপূর্ব আটককে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তিনি বাংলাদেশ সরকারের তত্ত্বাবধানে কারাগারে যত মৃত্যু হয়েছে, প্রতিটির স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
দেশের গণমাধ্যমেও এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনের এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণ প্রতিবেদনে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, কামাল আহমেদ মজুমদার, শাহরিয়ার কবির, র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, রমেশ চন্দ্র সেন ও এস এম জিয়াউল হক জিয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমও প্রতিবেদনে রমেশ চন্দ্র সেন ও এস এম জিয়াউল হক জিয়ার কারাগারে মৃত্যুর বিষয়টি আলাদা করে উল্লেখ করেছে।
সব মিলিয়ে, ২৩ আগস্টের এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনটি শুধু আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কতজন কারাগারে আছেন, সেই সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি; বরং বিচার শুরুর আগে দীর্ঘ আটক, জামিনের সুযোগ, কারাগারে চিকিৎসা এবং হেফাজতে মৃত্যুর জবাবদিহির বিষয়টিকে সামনে এনেছে। সংগঠনটির মূল বক্তব্য হলো—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও বিচার শুরুর আগে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা স্বাভাবিক নিয়ম হতে পারে না। প্রত্যেক ব্যক্তির আটকাদেশ আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে তা আইনগত ও প্রয়োজনীয় কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনার নীতিও বজায় রাখতে হবে।
খবরটি শেয়ার করুন