ছবি: সংগৃহীত
গ্রীষ্মের শুরুতেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আবারও সংকটে পড়েছে। কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ঘাটতি, আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব একসঙ্গে এসে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে চাপে ফেলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে—বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে গ্রামাঞ্চলে, যেখানে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটে। যদিও বিকেল ৫টার দিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো হলে লোডশেডিং কমে ৯০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে, তবে সেটি সাময়িক স্বস্তি মাত্র।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কাছে ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে। এই বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়মিত জ্বালানি কিনতে পারছে না। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট বর্তমানে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করছে। একইভাবে মাতারবাড়ীর ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র উৎপাদন করছে মাত্র ১৫০ মেগাওয়াট। আরএনপিএল-এর মতো বড় কেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছে।
এসএস পাওয়ারের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবাদত হোসেন জানিয়েছেন, পিডিবির কাছে তাদের ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে কয়লাবাহী জাহাজের ভাড়া টনপ্রতি ৮ থেকে ১০ ডলার বেড়ে গেছে। সরকার সেই অতিরিক্ত ভাড়া দিতে রাজি না হওয়ায় কয়লা আমদানি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। বর্তমানে তাদের প্ল্যান্টে মজুত আছে মাত্র ১ হাজার ৬০০ টন কয়লা।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি করা হয়। তবে চলতি বছর দেশটি উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মার্চের পর থেকে নিয়মিত কয়লা পাওয়া যায়নি। যদিও ১৬ এপ্রিল ৬০ হাজার টনের একটি কয়লার জাহাজ এসেছে, এতে কিছুটা উৎপাদন বাড়ার আশা করা হচ্ছে।
কয়লার পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও সংকটে রয়েছে। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৭২১ মেগাওয়াটের মতো। এর প্রধান কারণ বকেয়া বিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি।
বর্তমানে প্রায় ৩০টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র সরকারের কাছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাবে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) নেতারা বলছেন, আর্থিক সংকটের কারণে অনেক কেন্দ্র তেল আমদানির এলসি খুলতে পারছে না। ব্যাংকের কিস্তি ও কর্মচারীদের বেতন দিতেও হিমশিম খাচ্ছে তারা।
আইপিপিগুলোর মোট তেল মজুতের ক্ষমতা ৩ লাখ ৬০ হাজার টন হলেও বর্তমানে মজুত আছে মাত্র ১ লাখ ৪২ হাজার টন। এই মজুত দিয়ে এপ্রিল মাসের মধ্যেই চলা সম্ভব হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে বর্তমানে ১ লাখ ৯২ হাজার টন ফার্নেস অয়েল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে ১৫ থেকে ১৬ দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন চালানো সম্ভব। কিন্তু নতুন করে তেল আমদানি করতে সময় লাগবে অন্তত ৪০ দিন।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বেড়েছে। ফার্নেস অয়েলের দাম প্রতি টন ৪০০ ডলার থেকে বেড়ে ৮০০ ডলারে পৌঁছেছে। দেশে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪ দশমিক ৬৯ টাকা হয়েছে। ফলে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিট ২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৬ টাকায় উঠতে পারে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে গ্রামাঞ্চলে। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। চট্টগ্রামের লোহাগড়ার এক বাসিন্দা জানান, দিনে-রাতে মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। কখনো টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বয়স্করা।
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে কুমিল্লা, বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিকাজ, ছোট ব্যবসা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম। বরং মে মাসে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে, যা লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ প্রতি ইউনিট ১২ টাকার বেশি হলেও তা বিক্রি করা হচ্ছে ৮ টাকার কমে। ফলে ভর্তুকি দিয়েও সংস্থাটি বড় ধরনের লোকসানে রয়েছে। গত অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বকেয়া পরিশোধ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন হবে। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটি আরও জোরালো হচ্ছে—গ্রামে কি বিদ্যুৎ যায়, নাকি মাঝে মাঝে আসে?
খবরটি শেয়ার করুন