মহসীন হাবিব। ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহসীন হাবিব বলছেন, এই প্রথম এবং শেষবারের মতো জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করল। অবশ্য দুই বছর আগেও জামায়াত স্বপ্ন দেখেনি ৭৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। এটা ১৫০-তে যেতে পারত। বরাবরই তারা ভুল করে বাঙালিকে রিড করতে। এবারও ভুলের পসরা বসিয়েছিল।
তিনি বলেন, ৪০-৫০ বছর আগে কমিউনিস্টেরা যেমন মস্কো, পিকিংয়ের আদলে রাষ্ট্রব্যবস্থা করার স্বপ্ন দেখতেন, জামায়াত তেমনই সৌদি আরবের আইন ও তালেবানি শাসনকে এ দেশে আরোপ করার খায়েশ লালন করেছে। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া আজ শনিবার (১৪ই ফেব্রুয়ারি) বিকেলে দেওয়া এক পোস্টে কথাসাহিত্যিক মহসীন হাবিব এসব কথা বলেন।
মহসীন হাবিবের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি কর্তৃপক্ষের ভেরিফায়েড করা নয়। তবে সুখবর ডটকম নিশ্চিত হয়েছে, অ্যাকাউন্টটি তিনিই পরিচালনা করেন। তার এই পোস্ট এর মধ্যে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে তিনি জামায়াতের রাজনীতির কয়েকটি ভুল তুলে ধরেছেন। তিনি পাঠকনন্দিত কথাসাহিত্যিক।
মহসীন হাবিব লেখেন, ১. জামায়াত নারী নেতৃত্বকে অস্বীকার করল। সৌদিয়ানেরা, তালেবানেরা যেমন করেন। কিন্তু জামায়াত বুঝল না এই ভূমির বাঙালি মুসলমানদের ইসলাম আলাদা। তিরিশ বছর দুই নারী (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া) এ দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো পপুলার নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারতের মুসলমানেরা একচেটিয়া ইন্দিরা গান্ধীকে সমর্থন দিয়ে এসেছেন। মধ্যযুগেও এখানে সুলতানা রাজিয়া প্রশংসার সঙ্গে শাসন করেছেন। যে বাংলাদেশে অধেক ভোট নারীদের, সেখানে মুখ-গোমরা করে তারা (জামায়াত) বলে দিল, নারী নেতৃত্ব ইসলামে অনুমোদিত নয়। সেটাও মুখের কথা ধরে নিলাম। কিন্তু একজন নারীকেও তারা প্রার্থী হিসেবে নমিনেশন দিল না। জামায়াত যদি অন্তত ৫টি (সংসদীয়) আসনে নারী নমিনেশন দিত, তাহলে নারী সমাজ ভিন্নভাবে হয়তো দেখত।
তিনি বলেন, ২.জামায়াত হিন্দু ভোট ক্যাশ করতে পারেনি। পারত। বিএনপির চেয়ে অন্তত একটি আসনে বেশি, অর্থাৎ ৬ থেকে ১০টি আসনে হিন্দু প্রার্থী দিতে পারত। তাতে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশাল সংখ্যক ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো এবং জামায়াতের একটি 'সেক্যুলার' চেহারা তৈরি হতো। এই মানসিকতা জামায়াত ধারণ করেনি। জামায়াত কখনোই বুঝতে চেষ্টা করেনি যে, দিরাজুদ্দিন আর ভজহরির বন্ধুত্ব এখানে ধর্ম ও রাজনীতিকেও ছাপিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ৩. জামায়াত ৫ই আগস্টের (২০২৪ সালের) পর রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন না করে বোকার মতো প্রতিহিংসাকে প্রাধান্য দিয়েছে (প্রধান উপদেষ্টা) ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তালে তালে। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া নিয়ে দেশবাসীর কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু তারপর ইতিহাস সমূলে উৎপাটনের যে নিষ্ঠুর পথ বেছে নিয়েছিল, তা এ দেশের মানুষ পছন্দ করেনি। শফিক সাহেব (শফিকুর রহমান, জামায়াত আমির) কিছুটা ধরতে পেরেছিলেন বিষয়টা, তাই বলে ফেলেছিলেন, আমরা মাফ করে দিয়েছি। কিন্তু তার অভিভাবক ড. ইউনূস এবং অন্যান্য সহকমীদের চাপে সেখান থেকে সরে যান। বিএনপির অনেক কর্মী আওয়ামী লীগের সমর্থকদের উপর নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। সেই সুযোগটা রাজনৈতিক চতুরতার সঙ্গে কাজে না লাগিয়ে জামায়াত নিষ্ঠুরতম হয়ে উঠেছিল।
তিনি লেখেন, ৪. রাজনীতিতে অনেক কিছুই ঘটে। জামায়াত ভারত বিরোধিতাকে ক্যাশ করতে চেয়েছিল। সেটা করতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে কোনো জোরালো লবিং করেনি। চোখের সামনে উদাহরণ আছে। ভারত ও তালেবানদের মধ্যে এখন যে মিষ্টি সম্পর্ক, তা জামায়াতও করতে পারত। অন্তত শত্রুভাবাপন্ন অবস্থানে না থাকলেও পারত। আমরা যত কথাই বলি, মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ভারত বাংলাদেশের জন্য সর্বদাই ফ্যাক্টর। এটা অস্বীকার করা কোনো বিরত্বের কাজ না, বরং বোকামি।
পোস্টে সবশেষে মহসীন হাবিব বলেন, জামায়াতের জন্য শেষ সুযোগ বলছি এই কারণে যে, ভবিষ্যতে দলটির মাথার উপর ড. ইউনূসের মতো আশীর্বাদ থাকবে না। আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতির চেহারায় অনেক বদল আসবে। সেখানে জামায়াতের ঝোক তুলার সুযোগ থাকবে না।
খবরটি শেয়ার করুন