প্রতীকী ছবি
শায়লা শবনম
'আমার বাচ্চাটা কী দোষ করেছিল?'- এই আহাজারি সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের স্ত্রীর। কারণ তাদের চার বছরের মেয়ে ফাহিমা আক্তারকে এক নরপশু ধর্ষণের পর হত্যা করেছে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত জাকির হোসেন নিহত ফাহিমার প্রতিবেশী এবং সম্পর্কে চাচা। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশকে জানিয়েছে, গত ৬ মে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে সে ফাহিমাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর জাকির ওই মরদেহ প্রথমে ঘরের ভেতরের একটি স্যুটকেসে লুকিয়ে রাখে। এলাকায় খোঁজাখুঁজি শুরু হলে লাশটি খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে, এমনকি সবার সঙ্গে শিশুটিকে খুঁজতেও যোগ দেন।
একদিন পর স্যুটকেস থেকে দুর্গন্ধ বের হলে গভীর রাতে একটি ডোবায় মরদেহ ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সেটি ভেসে ওঠায় পরে ডোবার পাশে গাছের নিচে লুকিয়ে রাখে। ৮ মে ওই ডোবা থেকে ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ফুলের মতো ফুটফুটে এই শিশুটিকে হত্যার প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে এসব ভয়ংকর তথ্য। ফাহিমা হত্যার ঘটনা প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কারণ শিশু ফাহিমা এখন শুধু একটি নাম নয়; সে বাংলাদেশের অসংখ্য নির্যাতিত শিশুর প্রতীক। যে দেশে শিশুরা নিরাপত্তার বদলে ভয় নিয়ে বড় হচ্ছে, সেখানে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড যেন সমাজের ঘুমিয়ে থাকা বিবেককে নতুন করে আঘাত করছে।
বলছে- আর কত ঘুমিয়ে থাকবে! নির্মম এসব হত্যা নিয়ে বিবেকবান মানুষদের একটাই প্রশ্ন- ছোট্ট মা পাখিদের কেন ওরা বাঁচতে দিলো না?
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসেই দেশে ১১৫ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১ জন শিশুকে। শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছে ৩৪ শিশু, আর পারিবারিক নির্যাতনে ২৫ শিশু।
এছাড়া ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে আরও দুই শিশু। একই সময়ে শিশুদের ওপর সহিংস ঘটনা ঘটেছে ১৯৯টি। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে—একটি শিশুর থেমে যাওয়া শৈশব, একটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।
ফাহিমা হত্যাকাণ্ড ছাড়াও সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্মম ঘটনা দেশজুড়ে মানুষের মনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। কারণ একের এক ঘটে চলেছে মেয়ে শিশুদের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। প্রশ্ন উঠেছে—ছোট্ট ফুলের মতো শিশুরা কেন এতো বেশি নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছে?
এর আগে, গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইকোপার্কে ৮ বছরের শিশু জান্নাতুন নেসা ইরাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা হরা হয়। জানা যায়, ঘটনার দিন সকালে চকলেট খাওয়ানো আর বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ইরাকে ইকোপার্কের ভেতরের পাহাড়ে নিয়ে যান ঘাতক। সেখানেই তিনি ইরাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় ইরা চিৎকার করে ‘বাবাকে বলে দেবে’ বলে জানালে তাকে কুপিয়ে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়।
পরে গলা দিয়ে রক্তঝরা অবস্থায় স্থানীয় শ্রমিকরা শিশুটিকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইরার মৃত্যু হয়। পরে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় অভিযুক্ত তারই প্রতিবেশী বাবু শেখকে। পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিতে আসামি জানায়, পারিবারিক বিরোধের জেরে সে শিশুটিকে হত্যা করেছে।
কুমিল্লার মুরাদনগরে ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। স্থানীয় জনতা অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে ছয় বছরের এক শিশুর মরদেহ ভুট্টাক্ষেত থেকে উদ্ধার হয়। তার পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আটক করা হয় শিশুটিরই দুলাভাইকে। নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছরের কিশোরী আমেনা বেগমকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সাবেক ইউপি সদস্যসহ তিনজনকে আটক করা হয়।
এছাড়া সম্প্রতি নেত্রকোণার মদনে ১২ বছরের এক কিশোরীর ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা সম্প্রতি দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে ধর্ষণের শিকার হয়ে অসংখ্য শিশু মানসিক ট্রমায় ভুগেছে, কেউ কেউ আত্মহত্যাও করেছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার প্রভাব সারাজীবন থেকে যায়। তারা ভয়, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগে।
এসব ঘটনায় একটি ভয়ংকর মিল আছে—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ছিল পরিচিত মানুষ। প্রতিবেশী, আত্মীয়, পরিচিত যুবক কিংবা পরিবারের কাছের কেউ। ফলে শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা এখন ঘরের ভেতরেও। পরিবার-পরিজন অথবা ভরসা করা মানুষরাই যেন শিশুদের ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হচ্ছে।
ক্রিমিনোলজি বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজে ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন মানুষকেই ভয় পাচ্ছে। মানুষের ভেতরের আগ্রাসী প্রবৃত্তি যখন সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখনই এমন সহিংসতা বাড়ে। সমাজ যদি অপরাধীকে ভয় না দেখিয়ে বরং প্রভাবশালী করে তোলে, তাহলে অপরাধ বাড়বেই।
দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের নেতিবাচক প্রভাব মানুষকে ক্রমশ সহিংস করে তুলছে। তার মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়াও অপরাধ বৃদ্ধির বড় কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগের মতে, যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কমেছে। মানুষ একাকিত্ব, হতাশা ও মানসিক চাপে ভুগছে। এর সঙ্গে মাদক যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
আইন আছে, প্রয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী, ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একইভাবে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ক্ষেত্রেও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ধর্ষণজনিত মৃত্যুর ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের আইন প্রয়োগের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ! ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে নয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।
এছাড়া অনেক মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তদন্তে গাফিলতি, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক চাপের কারণে বিচার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ জানিয়েছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে। ফলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় হারিয়ে ফেলছে।
পুলিশ বলছে, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ আলোচিত ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নির্যাতিতদের আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে থাকে।
জরুরি সহায়তার জন্য ৯৯৯ এবং মন্ত্রণালয়ের হটলাইনও চালু রয়েছে। তবে অধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—সমাজ ধীরে ধীরে এসব ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতনের খবর মানুষের ভেতরে এক ধরনের অসাড়তা তৈরি করছে। যেন ছোট্ট শিশুদের মৃত্যু আর আমাদের নাড়া দেয় না। কিন্তু একটি সভ্য সমাজ কখনো শিশুদের কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না। প্রয়োজন—দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়ানো, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, পরিবারে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সহজ আইনি সহায়তা ও কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে বড় কথা- শিশুদের কথা শুনতে হবে। তাদের নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অগ্রাধিকারে এনে নিশ্চিত করা। মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেছেন, নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু বেসরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সরকারকেও কার্যকর দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি মনে করেন, আদালতের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ার কারণে অনেক পরিবার বিচার পেতে নিরুৎসাহিত হয়। অথচ হত্যার শিকার ফাহিমা, ইরাসহ নাম না জানা এই শিশুরা তাদের স্বপ্ন সাধনা, এ দেশের ভবিষ্যত। অথচ নিষ্ঠুর এই সমাজ আমাদের ছোট মা পাখিদের বাঁচতে দিল না!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন