ছবি: সংগৃহীত
দিল্লির কনট প্লেসসহ বিভিন্ন এলাকায় ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) বিক্ষোভ করছে। এই বিক্ষোভের পাল্টা অবস্থান নিতে, সোজা কথা তাদের দমনে এবার সামনে এসেছে ‘লাল হিট জনতা পার্টি’ নামে একটি সংগঠন। ভারতে সাধারণত ‘লাল হিট’ নামে একটি তেলাপোকা নিধন স্প্রে বিক্রি করা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় গতকাল রোববার দিল্লির মালব্য স্মৃতি ভবনে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিরোধিতা করে নিজেদের প্রথম সদস্য সমাবেশের আয়োজন করে সংগঠনটি। অনুষ্ঠানে সংগঠনটির প্রধান অয়ন ভাটনগরসহ অন্য বক্তারা সিজেপি, কংগ্রেস ও বিক্ষোভকারীদের সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, এসব বিক্ষোভ দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ক্ষতি করছে।
‘মোদিজি ডাক দিলে আরও বেশি মানুষ জড়ো হবে’
অয়ন ভাটনগর বলেন, সংগঠনটির ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা এবং অল্প সময়ের নোটিশে যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে একত্র করা সম্ভব, তা দেখানোই ছিল এই সমাবেশের উদ্দেশ্য। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি মানুষকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানান, তাহলে কত মানুষ জড়ো হবেন?
দাশেরাকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে ভাটনগর বলেন, মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। বক্তব্য দেওয়ার সময় বিক্ষোভকারীদের বোঝাতে তিনি ‘পোকামাকড়’, ‘তেলাপোকা’ এবং ‘তেলাপোকার মতো প্রাণী’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেন।
ভাটনগর বলেন, দাশেরা থেকে দীপাবলি পর্যন্ত সময়টি সারাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসার মৌসুম। তাই কনট প্লেসের মতো বড় বাণিজ্যিক এলাকায় কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করা মেনে নেওয়া হবে না। তার অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা দিল্লিসহ একাধিক বড় শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করার চেষ্টা করেছেন।
‘বিক্ষোভ করে সরকার পরিবর্তন হবে কীভাবে?’
আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের ‘সরকার পরিবর্তন’ বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ সম্পর্কিত বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে ভাটনগর প্রশ্ন করেন, বিক্ষোভের মাধ্যমে কীভাবে সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব? তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করার মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা দুর্বল করা হচ্ছে।
ভাটনগরের বক্তব্য, আজ যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করা হয়, তাহলে আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী মোদির পদত্যাগের দাবিও উঠতে পারে। তিনি আরও বলেন, কোনো একটি গোষ্ঠীর ৫০ হাজার মানুষ একত্র হলেই তাদের দাবি মেনে নিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ২০২৩ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য চালু করা ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন ভাটনগর। তার দাবি, ওই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের নেতাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করার আগে বিক্ষোভকারীদের নিয়োগের পদ্ধতি এবং আগের প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের কার্যকাল সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া উচিত।
‘আমরা গণতন্ত্র বাঁচাতে চাই’
ভাটনগর বলেন, গণতন্ত্র রক্ষার উদ্দেশ্যেই লাল হিট জনতা পার্টি গঠন করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের উদ্দেশ্য হলো পুলিশ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করা। তিনি দাবি করেন, কংগ্রেস ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ) সিজেপিকে সমর্থন দিচ্ছে। তার মতে, এসব গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হলো বিজেপি সরকারকে সরিয়ে নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
ভাটনগর বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করা উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক পরিবেশ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ক্ষতি করছে।
ককরোচ জনতা পার্টির সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাদের বিক্ষোভে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব পড়বে না।
‘পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা সহ্য করা হবে না’
বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ সদস্য ও নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগও তোলেন ভাটনগর। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি সূর্য নমস্কার করেন এবং তাকে মৌখিক অপমান সহ্য করতে দেখা যেতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অন্য সবাইকেও অপমান সহ্য করতে হবে।
ভাটনগরের বক্তব্য, দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গালিগালাজ করা এবং পুলিশের প্রতি মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দশেরার দিন থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র অবসান শুরু হবে। তিনি এই ঘটনাকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেন।
পবন নামে এক সাংবাদিক বলেন, ‘যেখানে তেলাপোকা থাকবে, সেখানে নিশ্চয়ই হিট থাকবে।’ এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তেলাপোকা মারার কীটনাশক ব্র্যান্ড ‘হিট’-এর নামের সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির নাম মিলিয়ে কটাক্ষ করেন।
তিনি দাবি করেন, চলমান আন্দোলনের কারণে ব্যবসায়ীদের ইতিমধ্যে ৩ হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। তার আশঙ্কা, এই ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে ১০ হাজার কোটি রুপি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পবন আরও বলেন, গত তিন দিন ধরে তিনি লাল হিট জনতা পার্টির কার্যক্রম অনুসরণ করছেন। ভাটনগর জানান, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তাদের সংগঠন সমর্থন পাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে এসে সরাসরি রাস্তায় নামার আহ্বান জানান। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান তারা।
খবরটি শেয়ার করুন