ছবি: সংগৃহীত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছিল একটি গানের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ। কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই প্রতিবাদ এখন পৌঁছে গেছে শ্রেণিকক্ষেও। সিলেটের এক প্রধান শিক্ষিকাকে ঘিরে শুরু হওয়া সাইবার বুলিংয়ের প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকারা যেমন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গান ব্যবহার করে সংহতি প্রকাশ করেছেন, তেমনি এবার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শিল্প, সাহিত্য ও সৃজনশীল স্বাধীনতার চর্চা ছড়িয়ে দিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই) সাভারের সেনা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি বিশেষ আয়োজন হিসেবে রাখা হয়েছে ‘বর্ষার গান ও কবিতা’ বিষয়ক ক্লাস। শিক্ষার্থীদের বর্ষার গান, কবিতা আবৃত্তি এবং নিজেদের লেখা কবিতা উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আসতে বলা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা শাফিনাজ গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মননশীলতা ও শিল্পচর্চার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি শালীন ও ইতিবাচক প্রতিবাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, “আমরা শিক্ষার্থীদের বর্ষার গান শিখে আসতে বলেছি। সেই সঙ্গে বর্ষা নিয়ে নিজেদের লেখা কিংবা কবিদের জনপ্রিয় সব কবিতার আবৃত্তি শিখে আসতে বলেছি।”
এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে গত কয়েক দিনের বহুল আলোচিত একটি ঘটনা। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল কয়েক দিন আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের রিল ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নীল শাড়ি পরে হেঁটে যেতে দেখা যায় তাকে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল আশির দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ড ডিফারেন্ট টাচ-এর গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’।
সাধারণ একটি ভিডিও প্রকাশের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাংশের তীব্র সমালোচনা ও ট্রলের মুখে পড়েন তিনি। স্থানীয় কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিডিওটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিউটি রানী পালের অভিযোগ, তার ভিডিও ডাউনলোড করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে কয়েকটি ফেসবুক পেজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা যায়, বিউটি রানী পাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। ২০১৬ সাল থেকে তিনি পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চলতি বছর তিনি সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত বিদ্যালয়ের পাঠদান, শরীরচর্চা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বৃক্ষরোপণ ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি।
ঘটনার পর গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বিউটি রানী পাল বলেন, একটি গান বা একটি ছোট ভিডিও প্রকাশ করাকে তিনি অন্যায় মনে করেন না। তার প্রশ্ন, মুখে আধুনিক শিক্ষার কথা বলা হলেও যদি সমাজের মানসিকতা সংকীর্ণ থাকে, তাহলে নতুন প্রজন্মকে কীভাবে মুক্তচিন্তার শিক্ষা দেওয়া সম্ভব?
এই ঘটনার পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই গান ব্যবহার করে নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেন। কেউ বিদ্যালয়ের মাঠে, কেউ শ্রেণিকক্ষে, কেউ আবার প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানকে সংহতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই গানটি ব্যক্তিগত বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়।
গানটির গায়ক মেজবাহ রহমানও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে লেখা একটি গান যে একসময় অন্যায্য সমালোচনার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠবে, তা তিনি কখনো কল্পনা করেননি। তার মতে, এই ঘটনা দেখিয়েছে—সংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, কখনো কখনো সামাজিক সংহতিরও ভাষা হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটেই সাভারের সেনা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের উদ্যোগকে অনেকে প্রতীকী গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের সীমা অতিক্রম করে শিক্ষার্থীদের সামনে গান, কবিতা ও সাহিত্যচর্চাকে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি শিল্প-সংস্কৃতি, সহমর্মিতা এবং মতপ্রকাশের ইতিবাচক চর্চাকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ, ট্রল কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণের সংস্কৃতির বিপরীতে সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদ একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের শুধু শিল্পচর্চায় আগ্রহী করবে না, বরং মতের ভিন্নতা প্রকাশে শালীনতা, সহনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্বও শেখাবে।
একটি সাধারণ রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক শেষ পর্যন্ত যে দেশের শিক্ষকসমাজের মধ্যে সৃজনশীল প্রতিবাদের নতুন ভাষা তৈরি করবে, আর সেই ভাষা একদিন শ্রেণিকক্ষেও জায়গা করে নেবে—কয়েক দিন আগেও হয়তো তা কেউ ভাবেননি। এখন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ শুধু একটি জনপ্রিয় গান নয়; অনেক শিক্ষকের কাছে এটি মর্যাদা, সহমর্মিতা এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
খবরটি শেয়ার করুন