ফাইল ছবি
দীর্ঘ ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক গুমের ঘটনা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য এম. ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর বনানী থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার ভাগ্যে কী ঘটেছিল—সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত।
তবে সাম্প্রতিক তদন্ত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্য এবং এক সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় বহুদিনের স্থবির তদন্তে নতুন গতি এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বহু বছর ধরে চাপা থাকা এই ঘটনার পেছনের চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসতে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়,, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার মো. সাইফুর রহমানকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে তিনি স্কোয়াড্রন লিডার পদে কর্মরত ছিলেন এবং র্যাবের গোয়েন্দা শাখায় দায়িত্ব পালন করতেন। পরে উইং কমান্ডার হিসেবে অবসরে যান। অবসরের পর একটি বেসরকারি বিমান সংস্থায় পাইলট হিসেবে কাজ করেন। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের জামাতা।
আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বিষয়টি পরে জানানো হবে। এই ঘটনাকে নতুন মাত্রা দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গত ২১ জুন দেওয়া সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েসের সাক্ষ্য।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে চলমান একটি মামলায় তিনি দাবি করেন, র্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল ইলিয়াস আলীকে আটক অভিযানে অংশ নেয়। সেই দলে স্কোয়াড্রন লিডার সাইফুর রহমানও ছিলেন।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে মহাখালী ওভারব্রিজ এলাকায় একটি মাইক্রোবাস নিয়ে র্যাবের সদস্যরা অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু সেখানে ইলিয়াস আলীকে আটক করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বনানী এলাকা থেকে সাদা পোশাকধারীদের মাধ্যমে ইলিয়াস আলী ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক আনসার আলীকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠে।
ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার সময় তিনি বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নেতা ছিলেন। সিলেট অঞ্চলে তার শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান ছিল। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে হোটেল শেরাটন (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল) থেকে বাসায় ফেরার পথে বনানীর ২ নম্বর সড়ক থেকে তার গাড়ি উদ্ধার হয়। গাড়ির ভেতরে ব্যক্তিগত সামগ্রী পাওয়া গেলেও ইলিয়াস আলী ও তার চালকের কোনো সন্ধান মেলেনি।
পরদিন থেকেই রাজধানীসহ সারাদেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিএনপি দেশব্যাপী হরতাল ও কর্মসূচি পালন করে। সে সময় ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার স্বামীর সন্ধান চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়জুড়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইলিয়াস আলীকে আটক করার অভিযোগ অস্বীকার করে। সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়, তার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ নেই। অন্যদিকে বিএনপি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পরিকল্পিত গুম।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গঠিত গুম তদন্ত কমিশনে নতুন করে অভিযোগ করেন তাহসিনা রুশদীর লুনা। পরে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। লুনা বলেছেন, এক যুগেরও বেশি সময় পর হলেও সত্য উদঘাটনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার আশা, তদন্তে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তারা র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছেন। আদালতে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হবে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের সম্পৃক্ততার সরাসরি ডিজিটাল প্রমাণ মেলেনি। তবে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলোও যাচাই করা হবে।
ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। ২০২২ সালে নেত্র নিউজ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, র্যাব-১-এর অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে সামরিক বাহিনী থেকে ডেপুটেশনে আসা কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত প্রতিবেদনটি র্যাব সদর দপ্তর, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং সামরিক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের কাছেও পাঠানো হয়েছিল।
সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অপহরণ অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছিল সিটিসেলের আটটি বিশেষ মোবাইল নম্বর। নম্বরগুলো ভুয়া পরিচয়ে কেনা হয়েছিল এবং মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য সক্রিয় ছিল। কল ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, নম্বরগুলো শুধু নিজেদের মধ্যেই যোগাযোগ করেছে। তদন্তকারীদের ধারণা ছিল, অভিযান পরিচালনার জন্য তিনটি আলাদা দল দায়িত্ব পালন করেছিল—একটি অপহরণে, একটি নজরদারিতে এবং আরেকটি যোগাযোগ ও মনিটরিংয়ে।
দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে গত এক যুগে ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, কালের কণ্ঠ, সমকাল, যুগান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বারবার লিখেছে, তদন্ত কার্যত স্থবির হয়ে ছিল। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মামলার তদন্তে প্রকৃত অগ্রগতি হয়নি এবং কোনো জবাবদিহিও নিশ্চিত করা হয়নি।
ইলিয়াস আলীর ঘটনা একক কোনো ঘটনা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুমের অভিযোগ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সসও একাধিকবার বাংলাদেশ সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রয়াত বিএনপি নেতা এম কে আনোয়ারের ছেলে সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ কয়েকজন নিখোঁজ হন। তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, তারা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম হয়েছেন। ২০১৯ সালে রাজধানা থেকে নিখোঁজ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবারক হোসেন। একইভাবে ব্যবসায়ী, ছাত্রনেতা ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের গুমের অভিযোগ নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলেছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সাত খুন। সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পরে আদালতের বিচারে র্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন। এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শত শত মানুষ গুম হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ অস্বীকার করা হলেও পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে স্বজনদের খুঁজে ফিরেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত গুম তদন্ত কমিশন একের পর এক অভিযোগ গ্রহণ শুরু করে। কমিশন জানিয়েছে, তারা শত শত অভিযোগ পর্যালোচনা করছে এবং বিভিন্ন সংস্থার নথি, ডিজিটাল তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করছে। কমিশনের কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। কারণ, এটি শুধু একজন বিরোধী দলের নেতার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং বিচারহীনতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় এ ঘটনাটি দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
বর্তমান তদন্তে যদি ডিজিটাল প্রমাণ, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে নতুন তথ্য উঠে আসে, তাহলে এক যুগের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা এই ঘটনার রহস্য উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে তদন্ত এখনো চলমান।
আদালতে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগে কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত তদন্ত, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আদালতের রায়ের ওপরই নির্ভর করবে ইলিয়াস আলী গুমের প্রকৃত ঘটনা এবং দায়ীদের পরিচয়।
খবরটি শেয়ার করুন