ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বাংলাদেশ যেন অন্য এক দেশে পরিণত হয়। শহরের অলিগলি, গ্রামের বাজার, চায়ের দোকান, অফিসের করিডর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই শুরু হয় ফুটবল নিয়ে তর্ক, বিশ্লেষণ আর আবেগের লড়াই। ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা, জার্মানি না স্পেন—এই প্রশ্নে কখনো বন্ধুরা বিভক্ত হন, কখনো একই পরিবারের সদস্যরাও দাঁড়িয়ে যান ভিন্ন শিবিরে। সেই উন্মাদনা থেকে দূরে থাকেন না শোবিজ তারকারাও। অভিনয়, গান কিংবা উপস্থাপনার ব্যস্ততার মাঝেও তাদের রয়েছে প্রিয় দল, প্রিয় খেলোয়াড় আর বিশ্বকাপ ঘিরে আলাদা আবেগ।
দেশের বিনোদন অঙ্গনের তারকাদের পছন্দ-অপছন্দের তালিকা দেখলে বোঝা যায়, দেশের সাধারণ দর্শকদের মতো তারাও মূলত কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শক্তির প্রতি ঝুঁকে আছেন। তবে সবাই যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার স্রোতে গা ভাসিয়েছেন, তা নয়। কেউ মুগ্ধ স্পেনের টিকি-টাকা ফুটবলে, কেউবা জার্মানির শৃঙ্খলাবদ্ধ খেলায়।
অভিনেতা আবুল হায়াতের ফুটবলপ্রেম নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ব্রাজিলের নিবেদিত সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তার কাছে ব্রাজিল কেবল একটি দল নয়, বরং ফুটবল নান্দনিকতার প্রতীক। বিশ্বকাপ এলেই তিনি আগ্রহ নিয়ে ব্রাজিলের ম্যাচের অপেক্ষা করেন। খেলার সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা আর আক্রমণভাগের ঝলক তাকে বারবার টেনে নিয়েছে সাম্বা ফুটবলের দিকে। ব্রাজিলের প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই গভীর যে নিজেকে তিনি দলের ‘ভক্ত’ নয়, বরং ‘পাগল সমর্থক’ বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ব্রাজিলের আরেক পরিচিত সমর্থক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর। ফুটবল নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা না বললেও বিশ্বকাপ এলে তার পছন্দের দল নিয়ে ভক্তদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। একই সারিতে রয়েছেন অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। তার মতে, ব্রাজিলের খেলায় এমন এক ছন্দ রয়েছে, যা অন্য অনেক দলের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। মাঠে বল পায়ে ব্রাজিলিয়ানদের স্বতঃস্ফূর্ততা তাঁকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে।
চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসও সাম্বা শিবিরের মানুষ। তার মতোই ব্রাজিলকে সমর্থন করেন বিদ্যা সিনহা মিম। মিমের কাছে ব্রাজিল মানেই কিংবদন্তি পেলের দেশ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ব্রাজিলের খেলা দেখে বড় হয়েছেন। ফলে বিশ্বকাপ এলেই তার আবেগ গিয়ে মিশে ব্রাজিলের হলুদ জার্সির সঙ্গে।
অন্যদিকে শোবিজ অঙ্গনে আর্জেন্টিনার সমর্থকের সংখ্যাও কম নয়। বরং বলা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লিওনেল মেসির জনপ্রিয়তার কারণে আর্জেন্টাইন শিবির আরও বড় হয়েছে।
অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী আর্জেন্টিনার একনিষ্ঠ সমর্থক। তার ফুটবলপ্রেমের গল্প অনেক পুরোনো। ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার প্রতি টান অনুভব করেছেন তিনি। সেই ভালোবাসা এখন পারিবারিক ঐতিহ্যের মতো। তার সন্তানেরও প্রিয় দল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ এলেই বাবা-ছেলের প্রত্যাশা এক জায়গায় গিয়ে মেলে—নীল-সাদা জার্সিধারীরা যেন সাফল্যের গল্প লেখে।
রাফিয়াত রশীদ মিথিলার হৃদয়ও আর্জেন্টিনার জন্য স্পন্দিত হয়। তার কাছে আর্জেন্টিনা মানেই ডিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার, আর বর্তমান সময়ে লিওনেল মেসির শিল্পিত ফুটবল। আর্জেন্টিনার খেলার নান্দনিকতা তাকে দীর্ঘদিন ধরে মুগ্ধ করে রেখেছে।
অভিনেত্রী তানজিকা আমিনও অকপটে নিজেকে আর্জেন্টিনা সমর্থক বলে পরিচয় দেন। ফুটবল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা কিংবা তর্কে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার মতে, প্রত্যেক সমর্থকেরই নিজের একটি আবেগের জায়গা থাকে, আর তার সেই জায়গাটি দখল করে আছে আর্জেন্টিনা।
ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা সজলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। তিনি মনে করেন, আর্জেন্টিনার সঙ্গে তার আবেগের বড় অংশ জড়িয়ে আছে ম্যারাডোনার স্মৃতির মাধ্যমে। শৈশবে দেখা সেই জাদুকরি ফুটবল আজও তার মনে রয়ে গেছে।
দর্শকপ্রিয় অভিনেতা জাহিদ হাসান, চিত্রনায়ক ইমন এবং মডেল-অভিনেত্রী মোনালিসাও আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে পরিচিত। বিশ্বকাপের সময় তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রায়ই দেখা যায় প্রিয় দলের প্রতি সমর্থনের প্রকাশ।
তবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজস্ব পছন্দ ধরে রেখেছেন কয়েকজন তারকা। তাদের মধ্যে অন্যতম অভিনেতা আজিজুল হাকিম। তিনি সমর্থন করেন জার্মানিকে। মজার বিষয় হলো, তার এই সমর্থনের পেছনে রয়েছে নিজের ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা। একসময় তিনি ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলেছেন। খেলোয়াড়ি জীবনের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জার্মান দলের কৌশল, শৃঙ্খলা ও দলগত সমন্বয়ের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে।
চলচ্চিত্র অভিনেতা সিয়াম আহমেদের পছন্দ আবার স্পেন। দেশের ফুটবল সমর্থকদের বড় অংশ যেখানে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বিভক্ত, সেখানে সিয়াম বরাবরই স্পেনের পাশে থেকেছেন। তার মতে, স্পেনের খেলার ছন্দ, বল নিয়ন্ত্রণ এবং দলগত বোঝাপড়া ফুটবলকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে তাই তিনি অপেক্ষা করেন স্পেন কতটা দূর যেতে পারে, তা দেখার জন্য।
দেশে ফুটবল সমর্থনের সংস্কৃতি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা প্রায়ই আলোচনা করেন। তাদের মতে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করলেও দেশের মানুষ ফুটবলকে নিজেদের উৎসবের অংশ বানিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন এখানে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের বড়রা যে দল সমর্থন করেন, অনেক সময় সন্তানরাও সেই দলকেই অনুসরণ করে। তারকাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ভিন্ন নয়।
আসলে বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি, পরিচয় ও ভালোবাসার এক অনন্য মঞ্চ। একজন দর্শক যেমন নিজের পছন্দের দলের জয়ে আনন্দে ভাসেন, তেমনি প্রিয় দলের পরাজয়ে মন খারাপও করেন। শোবিজ তারকারাও সেই অনুভূতির বাইরে নন। ক্যামেরার সামনে তারা যতই পেশাদার হোন না কেন, বিশ্বকাপের রাতে তাদের অনেককেই দেখা যায় সাধারণ সমর্থকের মতোই টিভির সামনে বসে থাকতে, প্রিয় দলের গোল উদ্যাপন করতে কিংবা হারের হতাশা ভাগাভাগি করতে।
তাই বিশ্বকাপ এলেই দেশের বিনোদন অঙ্গনেও যেন তৈরি হয় আরেকটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা—কে কোন দলের সমর্থক। কেউ ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে, কেউ আর্জেন্টিনার নীল-সাদায়, কেউবা জার্মানি কিংবা স্পেনের পতাকায় নিজের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটান। মাঠের লড়াই যতটা খেলোয়াড়দের, গ্যালারির বাইরে আবেগের সেই লড়াই ততটাই সমর্থকদের। আর সেই সমর্থকদের সারিতে দেশের জনপ্রিয় তারকারাও যে সমান উচ্ছ্বসিত, তাদের পছন্দের দলগুলোর তালিকাই তার প্রমাণ।
খবরটি শেয়ার করুন