মঙ্গলবার, ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি শেষে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** ইসলামি বইমেলায় জঙ্গি নেতাদের বই কীভাবে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে, প্রশাসন কী করছে *** ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইকে কেন্দ্র করে জামায়াতের ক্ষমাপ্রার্থনা কেন আলোচনায় *** হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ফিরে পেতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সিএনএন, পলিটিকোর মামলা *** তারেক রহমানের উপহার দেওয়া ইসরায়েলি লেখকের বই কেন ফেরত নিল ধর্ম মন্ত্রণালয় *** বিশ্ববাজারে কমলেও দেশে কেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়াচ্ছে সরকার, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কী ছিল *** জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনজীবন আরও দুর্বিষহ হবে: জামায়াত *** জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবি পরিবহন মালিকদের *** জ্বালানি পাচার রোধে মূল্য সমন্বয় করেছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী *** বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে ১০১ ডলার

সুখবর এক্সপ্লেইনার

ইসলামি বইমেলায় জঙ্গি নেতাদের বই কীভাবে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে, প্রশাসন কী করছে

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ১২:১০ পূর্বাহ্ন, ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব ও দক্ষিণ প্রাঙ্গণে চলছে মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক ইসলামি বইমেলা। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগ ও প্রকাশকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির আয়োজনে ১২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই মেলা চলবে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। উদ্বোধন করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।

এই মেলার উদ্দেশ্য ইসলামি জ্ঞান, সাহিত্য ও গবেষণাধর্মী বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু মেলায় ঘুরে এমন কিছু বইয়ের সন্ধান মিলেছে, যেগুলোর লেখক হিসেবে রয়েছেন আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষস্থানীয় নেতা, সংগঠনটির বিভিন্ন শাখার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সশস্ত্র জিহাদপন্থী মতাদর্শ প্রচারের সঙ্গে যুক্ত বক্তারা। এসব বই শুধু মেলার কয়েকটি স্টলেই নয়, বাংলাবাজারের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, অনলাইন বই বিক্রির ওয়েবসাইট এবং ই-বুকের বাজারেও পাওয়া যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আল-কায়েদা ও আইএসবিরোধী নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আল-কায়েদা একটি তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠন। গত ৪ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা তালিকায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা রয়েছে। আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরিও ওই তালিকায় রয়েছেন। নিরাপত্তা পরিষদের নথিতে তাকে আল-কায়েদার নেতা এবং ওসামা বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন একটি সংগঠনের মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বই দেশে কীভাবে প্রকাশনা ও বিপণনের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

বাংলা স্ট্রিমের একটি বিশেষ প্রতিবেদন বলছে, আল-কায়েদার আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পরিচিত প্রয়াত আবদুল্লাহ আযযাম, সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন, সাবেক প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং ভারতীয় উপমহাদেশভিত্তিক আল-কায়েদা শাখার সাবেক ও বর্তমান নেতাদের বই বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগে আলোচিত ও দণ্ডিত বক্তাদের অনূদিত বইও পাওয়া যাচ্ছে।

আবদুল্লাহ আযযামের সঙ্গে ওসামা বিন লাদেনের সম্পর্ক এবং আল-কায়েদার বিকাশের ইতিহাস জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নথিতেও এসেছে। নিরাপত্তা পরিষদের তথ্যমতে, আল-কায়েদা আফগানিস্তানে যোদ্ধাদের অর্থায়নের জন্য গড়ে ওঠা একটি নেটওয়ার্ক থেকে বিকশিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিন লাদেনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। সংগঠনটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফা এ প্রসঙ্গে বাংলা স্ট্রিমকে বলেন, যেসব বইয়ের লেখকেরা বৈশ্বিক সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত, তাদের লেখা বা বয়ান বাজারজাত করার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকেই যায়। তার মতে, উগ্রবাদ নিয়ে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি ও স্থায়ী কাঠামো থাকা দরকার। শুধু আলেম-উলামাদের একটি অংশের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ঘরানার গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে এ ধরনের বিষয়ে পরামর্শক কাঠামো গঠন করা যেতে পারে।

এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ মেলার আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি প্রকাশনীই দীর্ঘদিন ধরে এসব বই প্রকাশ করে আসছে। বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারের একজন প্রকাশক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা স্ট্রিমকে বলেন, সিয়ান, সন্দীপন, সমকালীন ও রুহামা—এই চারটি প্রকাশনী সালাফি ঘরানার বই প্রকাশ করে। তার অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি বেছে বেছে উগ্রপন্থী নেতাদের বই বাজারে আনে। তার দাবি, প্রকাশনীগুলোর কারও কারও সঙ্গে সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় অন্য প্রকাশকেরা তাদের নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।

রুহামা পাবলিকেশন্সের মালিক রফিকুল ইসলাম আবার মেলার আয়োজন কমিটির সদস্যও। আল-কায়েদার নেতা খালিদ আল হুসাইনান ওরফে আবু জায়েদ আল-কুয়েতির বই প্রকাশের বিষয়ে তিনি একটি বাংলা স্ট্রিমকে বলেন, বইগুলো অনেক আগের এবং অনূদিত। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল। এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় সামনে আসার পর নতুন করে এসব বই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে মেলায় বইগুলো বিক্রি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আছে। এগুলা তো শুধু আমরাই করিনি, আরও অনেকেই করেছে।’

খালিদ আল হুসাইনানের একাধিক বই রুহামা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত এই আল-কায়েদা নেতার বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে একাধিক বই এখনো অনলাইন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। রকমারিতেও তার একাধিক বই ও প্যাকেজ বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। আল-কায়েদার এই নেতার পরিচিতি দিতে গিয়ে রকমারির ওয়েবসাইটে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে তাঁর দাওয়াত ও জিহাদ কার্যক্রমকে প্রশংসাসূচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে রকমারির হেড অব ব্র্যান্ড বা বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের প্রধান মাহমুদুল হাসান সাদি বলেন, বই নিবন্ধনের তথ্য প্রকাশকেরা তাদের প্যানেল থেকে দেন। বই ও লেখকের পরিচিতিও প্রকাশকেরাই সরবরাহ করেন। বছরে ১০ হাজারের বেশি বই প্রকাশিত হওয়ায় প্রতিটি বইয়ের বিষয়বস্তু হাতে ধরে যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কোনো বই নিয়ে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার বক্তব্য, কোন বই প্রকাশ করা হবে বা হবে না, সে বিষয়ে স্পষ্ট সরকারি নীতিমালা না থাকায় অনলাইন বই বিক্রেতাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।

ওয়াফিলাইফের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুবায়েত আসিরুল বারীও প্রায় একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন গণমাধ্যমের কাছে। তার ভাষ্য, প্রকাশকেরা তাদের প্যানেলে বইয়ের তথ্য দেন। তাদের প্রতিষ্ঠানও প্রকাশকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বই বাজারজাত করে।

বাতিঘরের মালিক দীপঙ্কর দাস বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান সব ধরনের বই বিক্রি করে। ক্রেতাদের আগ্রহ অনুযায়ী বই রাখা হয়। তবে কোনো বইয়ের বিষয়বস্তু কাউকে আহত করছে বা উগ্রপন্থাকে উৎসাহ দিচ্ছে—এমন তথ্য জানা গেলে সেটি বিক্রি করা হয় না। আল-কায়েদার নেতার বই বিক্রির বিষয়ে তার বক্তব্য, এ ধরনের বইয়ের ব্যাপারে সরকারের আরও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, রুহামা ছাড়াও আর-রিহাব, শব্দতরু, চেতনা, ইলমওয়েব, ইলমহাউস, খান প্রকাশনীসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান এসব লেখকের বই প্রকাশ বা বাজারজাত করেছে। আর-রিহাবের প্রকাশিত বইয়ের তালিকায় ওসামা বিন লাদেন, আয়মান আল-জাওয়াহিরি, আসেম ওমর, মোল্লা দাদুল্লাহ, শাইখ ইউসুফ আল-উয়াইরি, আবু উসামা, আসিম আল বারকাওয়ি ওরফে আবু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসি এবং আহমাদ ফারুকের নাম এসেছে।

২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাবাজার থেকে আর-রিহাবের মালিক হাবিবুর রহমান ওরফে শামীমকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট। পরে পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য এবং মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানীর মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উগ্রবাদসংশ্লিষ্ট বই প্রকাশ ও বিক্রি করতেন। তবে বর্তমানে আর-রিহাবের মালিক হাবিবুর রহমান এসব বই প্রকাশ বা বিক্রির কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রশাসনিক ঝামেলার কারণে আগে বিক্রি করা কিছু বই এখন বাদ দিয়েছেন।

আর-রিহাবের প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আহমাদ ফারুককে নিয়ে লেখা একটি স্মৃতিকথা। ২০১৫ সালে পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার দ্বিতীয় সারির গুরুত্বপূর্ণ নেতা আহমাদ ফারুক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তার স্ত্রী ও সশস্ত্র সংগ্রামের সহযোগীর লেখা স্মৃতিকথা প্রকাশ করে আর-রিহাব। বইটির অনুবাদক মুফতি আরিফ মাহমুদ। তিনি বইটি মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানীকে উৎসর্গ করেছেন এবং উৎসর্গপত্রে রাহমানীর কারাবাস, ত্যাগ, কুরবানি ও শাহাদাতের পথকে প্রশংসার ভাষায় তুলে ধরেছেন।

শব্দতরু প্রকাশ করেছে শাইখ খালিদের একাধিক বই। একই প্রকাশনী আল-কায়েদার নেতা শাইখ আবু হামজাহর বইয়ের অনুবাদও প্রকাশ করেছে। আবু হামজাহকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। তার সঙ্গে আফগান যুদ্ধ এবং আবদুল্লাহ আযযামের যোগাযোগের ইতিহাসও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নথিতে এসেছে।

ইলমওয়েব বাজারে এনেছে আহমাদ মুসা জিবরিল ও আসিম আল বারকাওয়ীর বই। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জিবরিলকে প্রভাবশালী উগ্রপন্থী সালাফি বক্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তার বক্তব্যে সশস্ত্র জিহাদকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রকমারিতে জিবরিলের দুই ডজনের বেশি বই ও প্যাকেজ এবং ওয়াফিলাইফে আরও বেশি বইয়ের তালিকা পাওয়া যায় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব বইয়ের প্রকাশকদের মধ্যে সন্দীপন, সমকালীন, ইলমওয়েব, ইলহাম, সীরাত, পেনফিল্ড, ইলমহাউস, সত্যায়ন, হাসানাহ, পথিক, ইহসান, চেতনা, সাবিল ও উদ্দীপনের নাম রয়েছে।

খান প্রকাশনীর স্টলেও আনোয়ার আল-আওলাকির কয়েকটি বই পাওয়া গেছে। আল-কায়েদা ইন অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলার গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত আওলাকি ২০১১ সালে ইয়েমেনে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। তার বইয়ের মধ্যে ‘পরকালের পথে যাত্রা’, ‘আল্লাহ আমাদের বিজয়ের জন্য প্রস্তুত করছেন’ এবং ‘মনস্তাত্ত্বিক লড়াই’ রয়েছে।

খান প্রকাশনীর মালিক ইসহাক খানের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। ২০২১ সালে তিনি মুক্তি পান। র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে পরিচিত মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানীর ছাত্র ছিলেন। ইসহাক অবশ্য আনোয়ার আল-আওলাকির বই প্রকাশের বিষয়ে নিজের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশে তিনি ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক দাওয়াহকেই বেছে নিয়েছেন এবং কোনো সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে যুক্ত নন।

এসব বইয়ের বিপণন শুধু দোকান বা বইমেলায় সীমাবদ্ধ নেই। বাতিঘর, রকমারি, ওয়াফিলাইফ, কিতাবঘর, রুহামাশপ, হালালপণ্য, নাফিউন, খিদমাহশপ, মামুন বুকস এবং বিভিন্ন ই-বুকের দোকানেও বইগুলোর উপস্থিতির কথা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন বিতর্কিত বক্তার ‘প্রস্তাবিত বই’ হিসেবে এগুলোর প্রচার করা হচ্ছে। আর-রিহাবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারে কোনো কোনো বইকে মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানী, আসিফ আদনান ও মুফতি হারুন ইজহারের মতো ব্যক্তিদের পছন্দের বই হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এখানেই বই বিক্রির প্রশ্নটি কেবল প্রকাশনা ব্যবসার বিষয় থাকে না। কারণ পাঠকের কাছে কোনো বইকে একজন জনপ্রিয় বক্তার পছন্দের বই হিসেবে তুলে ধরলে সেটি সাধারণ বইয়ের চেয়ে আলাদা বিপণন সুবিধা পায়। বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বড়।

লেখক সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর বলেন, ইসলামি বইয়ের প্রধান পাঠকদের বড় একটি অংশ তরুণ। আবেগ ও কল্পনার বয়সে তারা কোনো কোনো উগ্রপন্থী লেখকের বক্তব্যকে ধর্মের ‘অকাট্য বাণী’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত বক্তাদের মাধ্যমে এসব বইয়ের প্রচার তরুণদের মধ্যে কঠোর মতাদর্শ তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব ইসলামি বইয়ের সামগ্রিক বাজারেও পড়ছে। সৃজনশীল ইসলামি সাহিত্য থেকে অনেক লেখক মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় বাজারে দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলেও তার মত।

এদিকে ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, জামিনে মুক্ত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য এবং বিভিন্ন দাওয়াহ গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে। কিন্তু তার বক্তব্যের পরদিন সিয়ান পাবলিকেশনের মালিক আহমদ রফিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছবিযুক্ত সংবাদ প্রকাশ করে সরকারের নজরদারি নিয়ে হুমকিসূচক রাজনৈতিক মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যের সঙ্গে বই বিক্রির সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত নয়, তবে উগ্রবাদ মোকাবিলায় নজরদারি ও প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

মেলার আয়োজক ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী বাংলা স্ট্রিমকে বলেন, আল-কায়েদা নেতাদের বই মেলায় বিক্রি হওয়ার বিষয়টি আগে তাদের জানা ছিল না। তিনি বলেন, তারা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রকাশকদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেন। আলেম-উলামারা যদি জানান কোনো বই আল-কায়েদার বই, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ তারা সমর্থন করেন না।

তবে প্রশ্ন হলো, মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কাছে আগে থেকে তথ্য না থাকলে বইমেলায় প্রকাশিত ও বিক্রি হওয়া বই যাচাইয়ের দায়িত্ব কার? দুই শতাধিক স্টলের এই আয়োজনে যেসব প্রকাশনী মূল ভূমিকায় রয়েছে, তাদের প্রকাশিত বইয়ের লেখক ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে ন্যূনতম যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটিও এখন সামনে এসেছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বাংলা স্ট্রিমকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়, মানুষের স্বাধীন জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত করে বা সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে—এমন বইয়ের বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। সরকার ব্যবস্থা না নিলে নাগরিক সমাজের উচিত বিষয়টি সামনে আনা।

জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সাবেক সদস্যসচিব ও বর্তমান নির্বাহী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম তালুকদার বাংলা স্ট্রিমকে বলেন, এ ধরনের বই প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। তার মতে, এসব বই সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মেলায় এমন বই কীভাবে ঢুকল, প্রকাশকেরা কীভাবে সেগুলো নিবন্ধন করলেন, মেলার আয়োজক কমিটি কী যাচাই করেছে এবং অনলাইন বই বিক্রেতারা কোন নীতিমালার ভিত্তিতে বইগুলো বাজারজাত করছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন প্রশাসনের কাছ থেকেই আসা প্রয়োজন।

কারণ সমস্যাটি শুধু একটি বইমেলার কয়েকটি স্টলে সীমাবদ্ধ নয়। একই বই যখন মেলার স্টল, বাংলাবাজারের দোকান, বড় অনলাইন বইয়ের বাজার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একসঙ্গে পাওয়া যায়, তখন এটি একটি বিস্তৃত প্রকাশনা ও বিপণন ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে। আর সেই ব্যবস্থার কোথাও যদি উগ্রবাদী মতাদর্শের প্রচার ঢুকে পড়ে, তাহলে শুধু একটি বই সরিয়ে ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে না।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, বইমেলার আয়োজক, অনলাইন বিক্রেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত যাচাইব্যবস্থা তৈরি করা যায় কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ঘরানার আলেম, গবেষক, শিক্ষক, প্রকাশক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী কাঠামো থাকলে বিতর্কিত বই চিহ্নিত করা এবং একই সঙ্গে বৈধ ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকাশনার স্বাধীনতা রক্ষা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বাংলা স্ট্রিমকে বলেছেন, বিষয়টি তাদের আগে জানা ছিল না এবং তথ্য পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে এখন দেখার বিষয়, এই অনুসন্ধানের পর মেলার স্টল, বাংলাবাজারের প্রকাশক এবং অনলাইন বইয়ের বাজারে তালিকাভুক্ত বইগুলোর বিষয়ে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়। কারণ প্রশ্নটি শুধু কোনো একটি বই বিক্রি হচ্ছে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো—উগ্রবাদী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত লেখকদের লেখা বাংলাদেশে প্রকাশ ও বিপণনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যাচাই ও নজরদারি ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর।

জঙ্গিবাদ জঙ্গি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি শেষে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলামি বইমেলায় জঙ্গি নেতাদের বই কীভাবে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে, প্রশাসন কী করছে

🕒 প্রকাশ: ১২:১০ পূর্বাহ্ন, ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইকে কেন্দ্র করে জামায়াতের ক্ষমাপ্রার্থনা কেন আলোচনায়

🕒 প্রকাশ: ১১:২৯ অপরাহ্ন, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ফিরে পেতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সিএনএন, পলিটিকোর মামলা

🕒 প্রকাশ: ০৮:৫৮ অপরাহ্ন, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

তারেক রহমানের উপহার দেওয়া ইসরায়েলি লেখকের বই কেন ফেরত নিল ধর্ম মন্ত্রণালয়

🕒 প্রকাশ: ০৮:৪০ অপরাহ্ন, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250