ফাইল ছবি
জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য দলটির আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর প্রকাশিত স্মৃতিকথাকে কেন্দ্র করে। জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল তার বইয়ে লিখেছেন, একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে দলের ভেতরে একাধিকবার ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নেতৃত্বের আপত্তি ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ নামের বইটি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ডে বইটির প্রকাশনা ও আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। সেখানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক আলী রীয়াজ, দ্য ডেইলি স্টারের পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ এবং ঢাকায় সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ আলোচনায় অংশ নেন। আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী ও দুই ছেলেসহ তার শুভানুধ্যায়ী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বইয়ে আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, ১৯৭১ সালের ভূমিকার প্রশ্নটি জামায়াতের জন্য দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে তৎকালীন জামায়াত আমির গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পর তার একটি জনসভায় দেওয়া বক্তব্যের আগে বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা হয়। সে সময় বক্তব্য প্রস্তুতে সহায়তার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু গোলাম আযম শেষ পর্যন্ত এমন একটি বক্তব্য দেন, যেখানে অতীতে কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করার অনুরোধ করা হয়। আবদুর রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এটিকে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য সরাসরি ক্ষমাপ্রার্থনা হিসেবে দেখেননি।
এরপর ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতসহ চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি আবার সামনে আসে। রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি দলীয় নেতৃত্বকে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে একটি বক্তব্য দেওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেন। একটি খসড়াও তৈরি হয়। সেই খসড়ায় একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে জামায়াতের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব ছিল। দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা এতে সমর্থন দিলেও শেষ পর্যন্ত তা অনুমোদন পায়নি।
২০০৫ সালেও বিষয়টি জামায়াতের কার্যনির্বাহী কমিটিতে আলোচনায় আসে। আবদুর রাজ্জাকের বই অনুযায়ী, তখনও প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। আপত্তির কারণ হিসেবে দলের ভেতর থেকে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া ভুল ছিল না এবং ভারতের আধিপত্যের আশঙ্কা ছিল। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা জামায়াতের কোনো ক্ষমাপ্রার্থনাকে গ্রহণ করবে না—এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছিল।
২০১৬ সালে বিষয়টি আবার নতুন করে সামনে আসে। জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব আবদুর রাজ্জাককে দলের ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে একটি বিবৃতির খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেয়। তিনি একটি খসড়া তৈরি করেন। ১৮ সেপ্টেম্বরের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ওই বিবৃতিতে জামায়াতের নেতৃত্ব সই করলে দলটির ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্নের সমাধান হতে পারত। তিনি রাজ্জাকের ওই উদ্যোগকে দূরদর্শী বলেও উল্লেখ করেন।
কামাল আহমেদও প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ২০১৬ সালের উদ্যোগের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ওই সময় ক্ষমাপ্রার্থনার খসড়া নিয়ে কয়েকটি বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যায়ে দলটির তৎকালীন শিক্ষা সম্পাদক পাকিস্তান অসন্তুষ্ট হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করার পর উদ্যোগটি আর এগোয়নি বলে আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে উল্লেখ আছে।
ক্ষমাপ্রার্থনার প্রশ্নে জামায়াতের ভেতরের এই দীর্ঘ টানাপোড়েনের পরিণতি ঘটে ২০১৯ সালে। আবদুর রাজ্জাক ১৯৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন। ২০০৩ সালে তিনি দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার প্রধান আইনজীবী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডন থেকে তিনি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের পদ ও দল থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া এবং সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দলের সংস্কার না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।
বইয়ের শেষ দিকে জামায়াতের ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের মূল্যায়ন লিখে গেছেন আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের ছায়া এখনো দলটির ওপর রয়েছে। তার মতে, স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি জামায়াতের তীব্র বিরোধিতা এবং সেই সময়ের কর্মকাণ্ডের জন্য পূর্ণ জবাবদিহি না করাকে ঘিরে জনমনে দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন রয়েছে। তাই রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে দলটিকে নিজেদের ইতিহাসের মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি আরও লিখেছেন, জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো অতীতনির্ভর ও রক্ষণশীল হয়ে পড়েছে। তরুণদের সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। নেতৃত্বে তরুণ ও সংস্কারপন্থী ব্যক্তিদের যুক্ত করা, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে সংলাপ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
রাজ্জাকের বইয়ের শেষ অধ্যায়ে জামায়াতকে পাঁচটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেওয়া। দ্বিতীয়ত, তরুণ ও সংস্কারপন্থীদের নেতৃত্বে আনা। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বৈচিত্র্য আনা। চতুর্থত, তরুণদের দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত করা। পঞ্চমত, নাগরিক সমাজের সঙ্গে অংশীদারত্ব ও উন্মুক্ত সংলাপের মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দলটি বিভিন্ন সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় গেছে। তিনি দলটির রাজনৈতিক কর্মকৌশলের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বইটিকে শুধু জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামপন্থী দলগুলোকে রাজনীতি করতে হলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও গণসার্বভৌমত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে গ্রহণ করতে হবে। অতীতের ভুলের বিষয়গুলোও তাদের মোকাবিলা করতে হবে।
ঢাকায় সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ ভার্চ্যুয়ালি আলোচনায় যুক্ত হয়ে বইটিকে আবদুর রাজ্জাকের অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন।
বইটি প্রকাশের আগে ও পরে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমাপ্রার্থনের প্রশ্নটি নিয়ে দলটির আগের বিভিন্ন অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। ১৯৯৪ সালে গোলাম আযমের বক্তব্যে অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়ার অনুরোধ ছিল। তবে আবদুর রাজ্জাক তার বইয়ে এটিকে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য সরাসরি ক্ষমাপ্রার্থনা হিসেবে গ্রহণ করেননি। পরে ২০০১, ২০০৫ ও ২০১৬ সালে ক্ষমাপ্রার্থনার খসড়া ও উদ্যোগের কথা তার বইয়ে এসেছে। ২০১৭ সালেও একাত্তরের ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে জামায়াত একটি বিশেষ কমিটি করেছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার অধিকাংশ সদস্য একমত না হওয়ায় সেই উদ্যোগও থেমে যায়।
পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও এ বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জামায়াতের কর্মকাণ্ডের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তাদের কাছে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। পরে ২২ অক্টোবর নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়েও তিনি ১৯৭১ সালসহ আগের সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে একই ধরনের নিঃশর্ত ক্ষমার কথা বলেন।
বইটি নিয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক লেখায় আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় জামায়াতের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের বিবরণ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, রাজ্জাক ৩৩ বছর জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলের নেতৃত্বের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নীতিগত অবস্থান নিয়ে বইটিতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বার্গম্যানের লেখায় ১৯৯৪ সালের গোলাম আযমের বক্তব্য, ২০০১ সালের খসড়া এবং ২০০৫ সালের উদ্যোগের কথাও এসেছে।
১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের অবস্থান পরিবর্তন এবং দলের সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন কাজ করার পর ২০১৯ সালে আবদুর রাজ্জাক দল ছাড়েন। মৃত্যুর আগে লেখা তার স্মৃতিকথা প্রকাশের পর এখন সেই প্রচেষ্টার নথি, বিশেষ করে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনের একাধিক ব্যর্থ উদ্যোগ, আবারও প্রকাশ্য আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন