রবিবার, ২৫শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আজই ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প *** সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের নিয়ম-কানুন পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এইচএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর *** টঙ্গীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ *** তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব *** সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিকের লাশ দাফনে বাধা, গোপনে গার্ড অব অনার *** মৃত্যুর জন্য ইউএনওকে দায়ী করে এসি ল্যান্ডের ফেসবুক পোস্ট, পরিবারের দাবি মানসিক সমস্যা *** সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডে কূটনৈতিক যোগাযোগের ফাঁক উন্মোচিত, ঢাকার অজান্তেই আরও ২০ জনের পরিণতি অনিশ্চিত *** আসিফ আকবরের চালকের পেছনের আসন বরাবর গুলি করা হয় *** এমপির বক্তব্যে ইউএনওর হাততালি, সমালোচনার মুখে বললেন ‘ভাইরাল হতে চাই’

আল কায়েদা, আইএস, তালেবানের আদলে পতাকা দেশজুড়ে, কারণ খুঁজছে পুলিশ ও গোয়েন্দা

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৬:৪১ অপরাহ্ন, ২৬শে জুন ২০২৬

#

ফাইল ছবি

বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ফ্রান্সের পতাকা টানানোর সংস্কৃতি দেশে বহু বছরের। কিন্তু চলতি জুন মাসে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাদা ও কালো রঙের কালেমা-খচিত পতাকা লাগানো, হাতে নিয়ে মিছিল এবং মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার ঘটনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কিছু জঙ্গিগোষ্ঠীর ব্যবহৃত পতাকার সঙ্গে নকশাগত মিল থাকায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, পতাকা প্রচারে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, এটি শুধু ইসলামি পরিচয় ও ধর্মীয় আবহ প্রকাশের উদ্যোগ, এর সঙ্গে কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের সম্পর্ক নেই।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মতিঝিলের শাপলা চত্বর, সাভারের হেমায়েতপুর, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, যশোর, বাগেরহাট, সিলেট, চট্টগ্রাম, পাবনা, জামালপুর, সন্দ্বীপ ও কোটালিপাড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক সপ্তাহে একই ধরনের পতাকা দেখা গেছে। কোথাও রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে টাঙানো হয়েছে, কোথাও মিছিল ও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায় বহন করা হয়েছে।

আজ শুক্রবার সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, কালেমা-খচিত পতাকা ওড়ানোর বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। একই দিন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, বিষয়টি পুলিশের নজরে রয়েছে এবং তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্তের মূল প্রশ্ন দুটি—এটি কি শুধু ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর আড়ালে কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক বা নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছরের ১৩ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও থেকে এ প্রচারণা গতি পায়। 'আল কুরআনের দারস' নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ভিডিওতে দেওবন্দি আলেম ও হেফাজতে ইসলামের সাবেক শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুফতি হারুন ইজহার বিদেশি পতাকার পরিবর্তে কালেমা-খচিত পতাকা ওড়ানোর আহ্বান জানান। বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্বকাপ উপলক্ষে যখন বিভিন্ন দেশের পতাকা টানানো হচ্ছে, তখন মুসলমানদেরও কালেমার পতাকা ওড়ানো উচিত।

এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সাদা-কালো পতাকার ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। তবে পরে হারুন ইজহার বলেন, বিদেশি পতাকার বিপরীতে ইসলামি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে কালেমার পতাকা ওড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু এটি নিয়ে যেভাবে শোডাউন করা হচ্ছে, ইসলাম তা সমর্থন করে না। তার দাবি, এই কার্যক্রমের সঙ্গে হিযবুত তাহরীর বা অন্য কোনো সংগঠনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

সুখবর ডটকমের তদন্তে উঠে এসেছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ১৭ জুন হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে ১৫ থেকে ২০ জন তরুণ সাদা-কালো পতাকা নিয়ে শোডাউন করেন। পরে যাত্রাবাড়ীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে সারিবদ্ধভাবে একই ধরনের পতাকা টাঙানো হয়। এ কর্মসূচির আয়োজকদের মধ্যে ছিলেন তামীম আল আদনান, যিনি 'টক অব ইনসান' নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন জাহিদুল ইসলাম মিরাজ, যার 'আস সিদক' নামে একটি পেজ রয়েছে, এবং এনামুল হাসান, যিনি 'ইবারাহ' নামে একটি পেজ পরিচালনা করেন। পুরো কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মওলানা বায়েজিদ খান। এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি হারুন ইজহার।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, 'ইবারাহ' ও 'আস সিদক' নামের ফেসবুক পেজ থেকে নিয়মিত এসব পতাকা বিক্রি করা হচ্ছে। ১৭ জুন গভীর রাতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে লাইভে এসে এনামুল হাসান জানান, পতাকা লাগানোর কাজে 'দাওয়াহ ফাউন্ডেশন' সহযোগিতা করছে। পরে ফাউন্ডেশনটির ফেসবুক পেজেও এ ক্যাম্পেইনে আর্থিক সহায়তার তথ্য প্রকাশ করা হয়।

এদিকে 'সাদাক্বাহ প্রজেক্ট' নামে আরেকটি উদ্যোগ থেকে সারাদেশে ১০ হাজার কালেমা-খচিত পতাকা বিতরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০ জুন রাতে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে পতাকা লাগানোর কার্যক্রম পরিচালনা করে সংগঠনটি। তাদের অ্যাডমিন আমিনুল হক লাইভে জানান, শাপলা চত্বর থেকে বায়তুল মোকাররম হয়ে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত পতাকা লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

পরে জানানো হয়, পাঁচ হাজার পতাকা বিনামূল্যে এবং আরও পাঁচ হাজার পতাকা বিনা লাভে বিতরণ করা হবে।

আমিনুল হক ঢাকার ফরিদাবাদের জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম আরবি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। তিনি 'জুলাই বিপ্লবী কাফেলা' নামে একটি ফেসবুক পেজের অ্যাডমিনও। তার বিরুদ্ধে রাজধানীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা রয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।

একই সময়ে 'দাওয়াহ ফাউন্ডেশন' দাবি করে, রাতে লাগানো কিছু পতাকা খুলে ফেলা হয়েছে। তারা ঘটনাটিকে 'ইসলামবিদ্বেষী' কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে নতুন করে পতাকা লাগানোর ঘোষণা দেয়।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, নুসাইবা শপ, আত তিজারাহ, মুসলিমবঙ্গ এবং শাইখুনা মিডিয়াসহ কয়েকটি ফেসবুক পেজ থেকেও এসব পতাকা বিক্রি ও প্রচার করা হচ্ছে।

রাজধানীর বাইরে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে সিংগাইর পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, শহীদ রফিক সেতু, যশোরের মনিহার চত্বর, হাটহাজারী, পাবনা, সন্দ্বীপ, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, সিলেটের কানাইঘাট, বাগেরহাট, নারায়ণগঞ্জ ও জামালপুরে একই ধরনের পতাকা দেখা গেছে। কোথাও সাদা কাপড়ে কালো অক্ষরে, আবার কোথাও কালো কাপড়ে সাদা অক্ষরে কালেমা লেখা হয়েছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, পতাকার দুটি নকশাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুল পরিচিত। সাদা পটভূমিতে কালো আরবি ক্যালিগ্রাফির পতাকা আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসনের পতাকার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। অন্যদিকে কালো পটভূমিতে সাদা অক্ষরে কালেমা লেখা পতাকা আল-কায়েদার বিভিন্ন শাখাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর ব্যবহৃত পতাকার সঙ্গে মিল রয়েছে।

নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরও অতীতে একই ধরনের সাদা ও কালো পতাকা ব্যবহার করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৭ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এবং একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে হিযবুত তাহরীর প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করে। সেখানে সাদা-কালো কালেমা-খচিত পতাকা, খিলাফতের দাবিসংবলিত ব্যানার ও লিফলেট ব্যবহার করা হয়। পরে সংগঠনটি বিভিন্ন স্থানে সভা, সমাবেশ, স্টল ও দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে। একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের অক্টোবরেও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় কালো পতাকা নিয়ে মিছিল হয়েছিল। সেই সময় ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ, মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার প্রতিবাদ এবং ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হয়। তদন্তে তখন অংশগ্রহণকারীদের অনেককে হিযবুত তাহরীরের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল এবং কয়েকজনকে আটকও করা হয়।

এবারও একই ধরনের পতাকা ব্যবহারের ঘটনায় কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীকের অর্থ শুধু লেখায় নয়, ব্যবহারের প্রেক্ষাপটেও নির্ভর করে। কালেমা মুসলমানদের সবচেয়ে সম্মানিত বিশ্বাসের ঘোষণা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যদি কোনো নির্দিষ্ট নকশা আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে একই নকশার পতাকা অন্যত্র ব্যবহৃত হলেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাফি মো. মোস্তফা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের পতাকা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতে দেখা গেছে কথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএসকে। ফলে দেশে একই ধরনের পতাকা ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভুল বার্তা যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

গবেষকদের মতে, মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে ইসলামের একক বা নির্ধারিত কোনো রাষ্ট্রীয় পতাকার ধারণা ছিল না। পরবর্তী বিভিন্ন খেলাফতের সময়ে বিভিন্ন রঙের পতাকা ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। তাই বর্তমান সময়ে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট সাদা-কালো নকশার পতাকাকে ইসলামের একমাত্র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করার ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল সমর্থকদের বিদেশি পতাকা ও সাম্প্রতিক কালেমা-খচিত পতাকাকে একইভাবে দেখা যায় না। একটি খেলাধুলাভিত্তিক সমর্থনের প্রতীক, অন্যটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত আদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রতীকের সঙ্গে নকশাগত মিল বহন করছে। ফলে দুটি প্রসঙ্গের সামাজিক ও নিরাপত্তাগত তাৎপর্য ভিন্ন।

বাংলাদেশ অতীতে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে একই ধরনের পতাকার বিস্তার নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি কেবল সামাজিক ও ধর্মীয় প্রচারণা, নাকি এর আড়ালে কোনো সংগঠিত আদর্শিক নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে উঠছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন মাঠে কাজ করছে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটগুলো।

আল কায়েদা আইএস তালেবানের আদলে পতাকা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250