ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দেশটিতে আটক ও দণ্ডিত বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলার রায় ও সাজার ধরন সম্পর্কে বাংলাদেশি কনস্যুলেট পর্যাপ্ত তথ্য পেয়েছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া বন্দিদের তালিকায় আরও ২০ বাংলাদেশির নামের পাশে দণ্ডপ্রাপ্তির উল্লেখ থাকলেও তাদের মামলার বিস্তারিত বিবরণ না থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেটের কাছে পাঠানো সৌদি কর্তৃপক্ষের বন্দিদের তালিকায় তাদের নাম ছিল। কিন্তু তালিকায় তাদের মামলার রায়, সাজার প্রকৃতি কিংবা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। ফলে বাংলাদেশি মিশনের কাছে দুই নাগরিকের আইনি পরিস্থিতি সম্পর্কে কী তথ্য ছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের সহায়তায় কী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনাটি কেবল দুই প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশের কারাগারে থাকা নাগরিকদের বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, তাদের আইনি অধিকার সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করা হচ্ছে, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের মামলার তথ্য না পাওয়া গেলে তার পক্ষে আইনি সহায়তা, আপিল কিংবা ক্ষমা প্রার্থনার উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ কতটা থাকে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি বন্দি ও আটক ব্যক্তির একটি তালিকা সরবরাহ করেছিল। ওই তালিকায় বশির ও সুইটির নাম ছিল। তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তালিকাটি আবার পর্যালোচনা করতে গিয়ে কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা আরও ২০ জনের নাম পান, যাদের পরিচিতির পাশে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও সাজাসংক্রান্ত বিবরণ ছিল না।
ওই কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করায় বন্দিদের বিষয়ে কনস্যুলার কাজের চাপও অনেক বেশি। ফলে অপরাধের ধরন ও সাজার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সহায়তার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। তবে বন্দির সংখ্যা বেশি হওয়া প্রশাসনিক চাপের ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের মামলার তথ্য যথাসময়ে শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয় না।
এই পরিস্থিতিতে ২০ অক্টোবর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা আঞ্চলিক শাখায় আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠায় জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশিসহ মোট ২২ জনের মামলার রায় এবং সাজাসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাওয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সৌদি কর্তৃপক্ষের তালিকায় ওই ব্যক্তিদের দণ্ডপ্রাপ্ত হিসেবে দেখানো হলেও রায়ের সারসংক্ষেপের জায়গায় কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তাদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করার জন্য মামলার বিস্তারিত জানা অপরিহার্য বলেও চিঠিতে জানানো হয়।
তালিকায় থাকা ২২ জনের মামলার ধরন বিশ্লেষণ করলেও উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট হয়। তাদের মধ্যে আটজন হত্যা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পাঁচজন মাদক পাচারের মামলায় এবং পাঁচজন ব্যক্তিগত অধিকার বা পাওনাসংক্রান্ত মামলায় বিচারাধীন কিংবা দণ্ডিত। আরও দুজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ, একজনের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং একজনের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যেকের আইনি পরিস্থিতি এক নয়। কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, আবার কারও মামলা ব্যক্তিগত অধিকার কিংবা পাওনাসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ভিন্নতা বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যেকের মামলার অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
কারাগারের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যেও বন্দিদের বিষয়ে নিয়মিত অনুসরণ ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়। তালিকা অনুযায়ী, ছয়জন জেদ্দার জাব্বান কারাগারে, ছয়জন শুমাইসি কারাগারে এবং চারজন জেদ্দা জেনারেল প্রিজনে রয়েছেন। অন্য ছয়জন নাজরান, খামিস, আল-বাহা, হাদ্দা ও জেদ্দার নারী কারাগারে বন্দি। বিভিন্ন কারাগারে ছড়িয়ে থাকা এসব নাগরিকের মামলা পর্যবেক্ষণ, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য কনস্যুলেটের কার্যকর তথ্যব্যবস্থা থাকা জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, বিদেশে কোনো নাগরিক আটক হলে কিংবা মারা গেলে কনস্যুলার যোগাযোগ ও বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয়ে ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ ও ৩৭ অনুচ্ছেদে বিধান রয়েছে। তার মতে, মৃত্যুদণ্ডের মতো ঘটনায় যোগাযোগের ঘাটতি থাকা দুঃখজনক।
শাহাব এনাম খান আরও বলেন, সৌদি আরবের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান রয়েছে। কঠিন আবহাওয়া ও প্রতিকূল পরিবেশে তারা বিভিন্ন শ্রমনির্ভর কাজে নিয়োজিত। এ বাস্তবতায় প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি কেবল বাংলাদেশের দায়িত্বের প্রশ্ন নয়; দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
তার পরামর্শ, সৌদি আরবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থায় স্থানীয় আইন, শ্রম আইন, সালিশি ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ আইনজীবী পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রবাসীদের আইনি সহায়তার ব্যয় নির্বাহের জন্য পৃথক তহবিল গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। আরবি ভাষায় দক্ষতার অভাবে অনেক আটক ব্যক্তি অভিযোগ, আদালতের কার্যক্রম কিংবা নিজেদের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পান না। এ ক্ষেত্রে ভাষাগত সহায়তা ও আইনি পরামর্শ তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ বাড়াতে পারে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিনই কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বন্দিদের বিষয়ে আরও কিছু অনুরোধ জানায়। পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে কারাবন্দি ও আটক বাংলাদেশিদের মুক্তি, দেশে ফেরত পাঠানো, ক্ষমা এবং বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়গুলো বিবেচনা করতে বলা হয়। যাদের সাজা শেষ হয়েছে, তাদের দ্রুত মুক্তি ও প্রত্যাবাসনের অনুরোধ করা হয়। যারা সাজার একটি অংশ শেষ করেছেন এবং কারাগারে ভালো আচরণের পরিচয় দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ক্ষমা বা মুক্তির বিষয়টি বিবেচনার আবেদন জানানো হয়। প্রথমবার আটক হওয়া এবং তুলনামূলক লঘু অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের অবশিষ্ট সাজা মওকুফের বিষয়েও অনুরোধ করা হয়। বিচারাধীন মামলাগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত আইনি নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়।
তবে এসব উদ্যোগের সময় ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মামলার বিস্তারিত চেয়ে চিঠি পাঠানোর ঘটনা দেখায়, তালিকায় নাম থাকা আর একজন বন্দির প্রকৃত আইনি অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকা এক বিষয় নয়। কেবল কারাগারে কতজন বাংলাদেশি আছেন, তাদের নাম কী কিংবা কোন কারাগারে রাখা হয়েছে—এমন তথ্য দিয়ে কার্যকর কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করা যায় না। মামলার পর্যায়, অভিযোগের ধরন, আদালতের রায়, আপিলের সুযোগ এবং সম্ভাব্য শাস্তি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্যও প্রয়োজন।
সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ইউরোপভিত্তিক সংস্থা ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরবে অন্তত ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। ‘ব্লাডশেড অ্যান্ড লাইস: মোহাম্মদ বিন সালমানস কিংডম অব এক্সিকিউশন্স’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে নথিপত্রের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য তুলে ধরা হয়। সংস্থাটির ২০২৫ সালের আরেকটি প্রতিবেদনেও একজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য রয়েছে। গত ১৪ অক্টোবরের দুই ঘটনাসহ ২০১০ সাল থেকে শনাক্ত এসব ঘটনার সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ১৯।
একই সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ২৪৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪৯০ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। বিদেশিদের মধ্যে পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন ১৬৪ জন, ইয়েমেনের ৯২ জন, সিরিয়ার ৫৮ জন, মিসরের ২৬ জন এবং জর্ডানের ২৫ জন। নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া ও চাদের নাগরিকদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান সৌদি আরবে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে। বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের জায়গা হলো, বিপুলসংখ্যক নাগরিকের কর্মসংস্থান ও বসবাসের দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে আটক বাংলাদেশিদের মামলা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ এবং তা নিয়মিত হালনাগাদ করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর আরও ২০ জনের বিষয়ে তথ্য চেয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কারা চূড়ান্ত দণ্ড পেয়েছেন, কারা আপিলের সুযোগ পাচ্ছেন এবং কারও ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ রয়েছে কি না, তা জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন। সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলার নথি না পাওয়া পর্যন্ত তাদের প্রত্যেকের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এখন বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থার সামনে তাৎক্ষণিক কাজ হলো, ওই ২২ জনের মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ, মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বন্দিদের অবস্থা যাচাই এবং প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে গুরুতর সাজা কার্যকরের আগেই সংশ্লিষ্ট মিশন যাতে তার মামলার বিষয়ে অবগত হতে পারে, সে জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত ও কার্যকর তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যথায় বন্দিদের তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও তাদের আইনি পরিণতি সম্পর্কে অন্ধকারে থাকার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
খবরটি শেয়ার করুন