ছবি: সংগৃহীত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন—এমন ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে দেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে নতুন হিসাব শুরু হয়েছে। সেই হিসাবের কেন্দ্রে এখন তিনটি বিষয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ।
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম, সাবেক কূটনীতিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্যে একাধিক ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে চায় দিল্লি। আবার কোথাও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ফলে কোনটি ভারতের প্রকৃত অবস্থান, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ধোঁয়াশা।
এর মধ্যেই আজ রোববার (১৬ আগস্ট) ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর আপাতত বাতিল হয়েছে। এর আগে কয়েক দিন ধরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এ সফর নিয়ে বিপরীতধর্মী খবর প্রকাশিত হচ্ছিল। ফলে সফরটি ঘিরে যে কূটনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউনের সাংবাদিক জয়তী মালহোত্রার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে না দিলে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমান যাবেন না। তবে এটি বাংলাদেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়। এটি প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে দাবি।
অন্যদিকে এনডিটিভি গত কয়েক দিনে জানিয়েছিল, আগস্টের শেষ সপ্তাহে তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রস্তুতি চলছে। সম্ভাব্য সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক হতে পারে বলেও সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছিল। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনায় আসতে পারে বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর রোববার পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়টিও সফরের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে বলে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ঢাকার অবস্থান এবং দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এর আগে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অথচ জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছিলেন, তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছেন।
২৯ জুলাই বাংলাদেশ জানিয়েছিল, ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। সম্মেলনটি ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে হওয়ার কথা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন বলেছিল, আমন্ত্রণ পাওয়া গেছে এবং সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
অর্থাৎ, একদিকে ভারত তারেক রহমানকে দিল্লিতে দেখতে চায়—এমন প্রকাশ্য বার্তা এসেছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ঢাকার অবস্থানও স্পষ্ট। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই এখন আটকে গেছে দুই দেশের সম্পর্ক।
ভারতের অবস্থান নিয়ে বিতর্কের আরেকটি দিক আরও রাজনৈতিক। ভারতীয় ও বাংলাদেশি কিছু চিন্তকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যে এমন ধারণা উঠে এসেছে যে শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ তৈরি করা হতে পারে। তারা বলছেন, বাংলাদেশে একটি কার্যকর বিরোধী দল প্রয়োজন। সেই যুক্তিতে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফেরানোর কথাও বলা হচ্ছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ ধরনের পরিস্থিতি। দিল্লি কি বাংলাদেশের নির্বাচিত নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজাবে? নাকি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখবে? এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য বক্তব্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দুই ধরনের ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।
দি প্রিন্টে ভারতে অবস্থানকারী নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক বয়ান প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের ভবিষ্যতে আবার একটি ‘জেন জি আলফা রেভল্যুশন’ বা নতুন প্রজন্মের বিপ্লবের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার জন্য ‘ডিপ স্টেট’ বা গভীর রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একই বয়ানে ভারত ও বাংলাদেশে নতুন পাল্টা আন্দোলনের প্রস্তুতির কথাও বলা হয়েছে।
ভারতীয় কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকের বক্তব্য নিয়েও বাংলাদেশে আলোচনা চলছে। বীণা সিক্রি, রিভা গাঙ্গুলি দাস ও শ্রীরাধা দত্তের মতো ভারতীয় চিন্তকের বক্তব্যে জুলাইয়ের আন্দোলনকে নিছক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে দেখার অনীহা রয়েছে বলে বাংলাদেশের বিভিন্ন আলোচনায় দাবি করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ আন্দোলনটির পেছনে সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নকশা বা ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’-এর কথা বলেছেন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।
এই বয়ানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বক্তব্যের মিল রয়েছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরেই ২০২৪ সালের আন্দোলনকে দেশীয় গণ-আন্দোলনের পাশাপাশি ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে ভারতীয় কয়েক বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের সাক্ষাৎকার নিয়েও একই কারণে আলোচনা হয়েছে। ভারতে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের এই নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের এবং বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার বক্তব্যে আবারও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার একটি বার্তা পাওয়া যায়।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা এসব বক্তব্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি দিল্লি থেকে বলেছেন, ডিসেম্বরেই দেশে ফিরতে চান। তার বিরুদ্ধে দেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। সেই রায়কে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য গার্ডিয়ানও তার ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা নিয়ে প্রতিবেদন করেছে।
এদিকে ভারতের কাছ থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে বাংলাদেশ। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের বড় বাধা হয়ে আছে।
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর প্রধান পরাগ জৈনের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরও এই প্রেক্ষাপটে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ট্র্যাট নিউজ গ্লোবালের প্রতিবেদনে সফরটিকে দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্কের নীরব যোগাযোগ বজায় রাখার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেও নিরাপত্তা চ্যানেল সচল রাখাই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে সেখানে বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী বাংলাদেশি কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমান তার এসএফ মিডিয়া নিউজে আরও কিছু দাবি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরাগ জৈনের ঢাকা সফরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো বাতিল করার দাবি উঠেছে। বিচার করতে হলে নতুন মামলা দিয়ে বিচার করার কথাও নাকি বলা হয়েছে। শেখ হাসিনার জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় থাকার ব্যবস্থার কথাও ওই দাবিতে এসেছে। এমনকি সাকিব আল হাসান ও নওফেলের বাড়িতে হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার চাওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
এসব দাবি স্বাধীন কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পরাগ জৈনের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে শৈবাল রায় চৌধুরীর উপস্থিতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ওই বৈঠকে মোবাইল ফোন নজরদারি কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন দাবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে মোবাইল নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহের অভিযোগও উঠেছে। এসব দাবিরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিতর্কের আরেকটি কেন্দ্র কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্ন। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ‘ইনক্লুসিভ’ বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছিল। ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীও তখন বলেছিলেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে ভারতের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হবে, সেটি তখন পরিস্থিতি দেখে নির্ধারণ করা হবে—এমন বক্তব্যের কথা আলোচনায় এসেছে।
এখন বাংলাদেশের কিছু টেলিভিশন আলোচনায় বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিলে দলটি আবার সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। এরপর শেখ হাসিনা দেশে ফিরে রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৭ সালে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ সেখানে অংশ নিতে পারে—এমন সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠেছে।
ভারতীয় ইউটিউব চ্যানেল স্কিল বাংলার উপস্থাপক এমন বক্তব্য দিয়েছেন যে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে না থাকলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের প্রভাববলয়ে চলে যেতে পারে এবং তার প্রভাব ভারতের ওপরও পড়বে। এই বক্তব্যও ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতি নয়। কিন্তু এসব বক্তব্য একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতের জনপরিসরে নানা ধরনের উদ্বেগ ও হিসাব কাজ করছে।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে ‘সেফ ল্যান্ডিং’ বা নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ধারণাটিও আলোচনায় এসেছে। ভারতীয় কূটনীতিকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাননি। তাকে নিরাপত্তা দিয়ে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের কিছু টেলিভিশন আলোচনাতেও একই ধরনের বক্তব্য শোনা গেছে।
কেউ কেউ এমন যুক্তিও দিচ্ছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক উপদেষ্টার বক্তব্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ফিরলে তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
এখানে অবশ্য আইনের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তার বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। ফলে তাকে কীভাবে দেশে ফিরিয়ে এনে কী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, সেটি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হওয়ার বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবুল কালাম আজাদ, যিনি বাচ্চু রাজাকার নামে পরিচিত, তার উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও পরে দেশে ফেরা সম্ভব হয়েছে।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রশ্নে ইতিহাসও আলোচনায় ফিরছে। ১৯৮০-এর দশকে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রেক্ষাপট এবং পরে এরশাদ আমলে তার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ তুলে অনেকে বলছেন, দিল্লি অতীতেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। আবার সমালোচকেরা বলছেন, আজকের বাংলাদেশ সেই পুরোনো বাংলাদেশ নয়।
তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে এই পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ঢাকা দেখাতে চেয়েছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন কোনো একটি দেশের প্রেসক্রিপশনে চলবে না। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন দেশের সক্ষমতা ও প্রয়োজন আলাদাভাবে যাচাই করার চেষ্টা চলছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে।
এ কারণেই শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখে তারেক রহমানের সঙ্গে একই সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার ভারতীয় উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক নয়। শেখ হাসিনা ও তারেক রহমানও একই রাজনৈতিক অবস্থানে নন। বাংলাদেশের নতুন সরকার এই পার্থক্যটিই দিল্লিকে বোঝাতে চাইছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
এদিকে এনসিপির নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের নতুন রূপরেখা নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া ঠিক হবে না। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা শাহজালাল বিমানবন্দরে মর্যাদার সঙ্গে ফিরবেন এবং লাখো মানুষ তাকে স্বাগত জানাবেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর এবং তারেক রহমানকে সমবেদনা জানানোর ঘটনাকে অনেকেই দিল্লির নতুন মনোভাবের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলো সেই আশাবাদে প্রশ্ন তুলেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও বলেছেন, তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, জুলাইয়ের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাবে কি না, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত।
এই জায়গাতেই আজকের কূটনৈতিক সংকটের মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়। দিল্লি কি নির্বাচিত নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করবে? নাকি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সেই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত রাখবে?
দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বহু নেতা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের কৌশল নিয়ে কাজ করছেন। অন্যদিকে এনডিটিভি বলছে, তারেক রহমানের ভারত সফর হলে সেটি হবে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বড় পরীক্ষা। সেখানে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, পানি, সীমান্ত, নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক—সবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি কী হবে। একদিকে ভারত চাইছে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে। অন্যদিকে ঢাকার কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি বড় রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ। ফলে সম্পর্কের টেবিলে এখন শুধু দুই দেশের স্বার্থ নেই। আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভবিষ্যৎও।
শেখ হাসিনা যদি সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তিনি দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে পারবেন কি না, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না, কিংবা ২০২৭ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না—এসব এখনো অনুমানের বিষয়।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট। ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতির যে পুরোনো সমীকরণ ভেঙে গেছে, সেটি আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া সহজ হবে না। ভারতও সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। ঢাকার অবস্থান এখন আগের চেয়ে কঠিন। দিল্লির অবস্থানও আগের মতো সরল নয়। একদিকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজন। অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রশ্ন।
এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারত যেন সত্যিই ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থায় পড়েছে। আর বাংলাদেশ বলছে, সম্পর্ক চাই। কিন্তু সেই সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে অতীতের অধ্যায় বন্ধ হবে, নাকি সেটিই নতুন সম্পর্কের শর্ত হয়ে থাকবে—আগামী কয়েক মাসে তার উত্তর মিলতে পারে। তারেক রহমানের আপাতত বাতিল হওয়া দিল্লি সফর সেই উত্তর পাওয়ার পথকে আরও কিছুটা দীর্ঘ করে দিল।
খবরটি শেয়ার করুন