ছবি: সংগৃহীত
করোনাভাইরাস মহামারি, রমজানের সময়সূচি এবং নানা বাস্তবতার দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে এবারের পহেলা বৈশাখে রাজধানীতে ফিরে এসেছে সেই চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য। বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের আমলে আয়োজিত এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রা যেন নতুন উদ্দীপনা, অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনটি এ বছর মানুষের ঢল, রঙিন মোটিফ ও বহুমাত্রিক অংশগ্রহণে যেন আবার ফিরে পেয়েছে তার হারানো জৌলুস। আয়োজকদের ভাষায়, ২০২০ সালের পর এবারই সর্বোচ্চ মানুষের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
প্রাণচাঞ্চল্যে রঙিন এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রা করোনাভাইরাস মহামারি ও রমজানের কারণে দীর্ঘ বিরতি শেষে এ বছর বৈশাখী শোভাযাত্রা তার চিরচেনা রূপে ফিরেছে, যেখানে ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ মানুষের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
আগে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত এই শোভাযাত্রা ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এবং ২০২১ সালে জনস্বাস্থ্য সতর্কতার অংশ হিসেবে বাতিল করা হয়েছিল। ২০২২ সালে শোভাযাত্রা পুনরায় শুরু হলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত উৎসবের সময়টি পবিত্র রমজানের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলক কম।
আর গত বছর মঙ্গল শোভাযাত্রা ঈদুল ফিতরের পরদিন অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবং ঈদের ছুটিতে নগরবাসীর বড় অংশ ঢাকা ছেড়ে যাওয়ায় উপস্থিতির সংখ্যা আরও কমে যায়।
এই দীর্ঘ প্রেক্ষাপটের পর এবারের আয়োজন যেন এক নতুন সূচনা। শুধু সাংস্কৃতিক দিক থেকেই নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতিফলনও অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব সাড়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং এই আয়োজনের শিল্পকর্ম সহযোগী মুনতাহা রহমান মানামী বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও আমরা প্রথমবারের মতো এই র্যালির প্রকৃত প্রাণচাঞ্চল্য ও বিশাল জনসমাগমের সাক্ষী হতে পারছি। গত কয়েক বছর এটি তার চিরচেনা রূপ ফিরে পায়নি।
এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রায় দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানকে তুলে ধরে পাঁচটি বড় প্রতিকৃতি বা মোটিফ প্রদর্শন করা হয়েছে। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আয়োজকরা নিপুণ মোটিফ, মুখোশ এবং ১৫০ হাত দীর্ঘ একটি পটচিত্র তৈরি করেন।
বর্ণাঢ্য এই শোভাযাত্রায় পাঁচটি প্রধান মোটিফ—মোরগ, হাতি, কবুতর, দোতারা এবং ঘোড়া বহন করা হয়। এসব প্রতীক শুধু গ্রামীণ ও লোকজ ঐতিহ্য নয়, বরং নতুন দিনের প্রত্যাশা, শান্তি, শক্তি ও ঐক্যের বার্তা বহন করে।
জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার চারুকলা অনুষদ থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়। ঘোড়সওয়ার পুলিশ, ডিবি, সোয়াট এবং র্যাবের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সেটি এগিয়ে চলে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটও পুরো সময় মিছিলের সঙ্গে ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন তৎপরতায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের নিরাপদে ও স্বস্তিতে বলে অনুভব করেন।
মোটিফগুলোর মধ্যে উদীয়মান সূর্যের প্রতীক সংবলিত মোরগের প্রতিকৃতিটি শোভাযাত্রার অগ্রভাগে ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির কাছে মেট্রোরেলের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় বিশাল এই কাঠামোটি সাময়িকভাবে আটকে যায়। তবে তা সফলভাবে পার হওয়ার শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
অন্যান্য প্রধান মোটিফ নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে অগ্রসর হয়। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড এবং বাঘ, প্যাঁচা ও খরগোশের মতো বিভিন্ন প্রাণীর রঙিন মুখোশ। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের উপস্থিতি এই আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
শোভাযাত্রায় আদিবাসী সম্প্রদায়, কৃষক, জেলে এবং ঢোলবাদকদের অংশগ্রহণ এর বৈচিত্র্য ও উৎসবের আমেজকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ঢোলের তালে তালে, মুখোশের রঙিন আভায় এবং মানুষের উচ্ছ্বাসে পুরো পরিবেশ যেন হয়ে ওঠে এক চলমান চিত্রকর্ম।
শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে ঢাকার শাহবাগ মোড়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র এবং দোয়েল চত্বর প্রদক্ষিণ করে। এরপর বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তা হয়ে পুনরায় শুরুর স্থানে ফিরে আসে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রা শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি দেশের সামাজিক ঐক্য, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং মানুষের অংশগ্রহণের প্রতীক হিসেবেও নতুন করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর এমন প্রাণবন্ত প্রত্যাবর্তন ভবিষ্যতের জন্যও আশাবাদী বার্তা বহন করছে।
খবরটি শেয়ার করুন