ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
আহমেদ তোফায়েল
বাঙালি উৎসবপ্রিয়, আর আমাদের প্রতিটি বড় উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক বিশাল অর্থনৈতিক আবর্ত। পবিত্র ঈদুল আজহা, বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। পশু কেনা থেকে শুরু করে উৎসবের আনুষঙ্গিক কেনাকাটা—সবখানেই প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) বা ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিনের (সিআরএম) ব্যাপক প্রসারের ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাংকের কাউন্টারে লাইনে দাঁড়ানোর চেয়ে বুথ থেকে টাকা তুলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু এবারের দীর্ঘ ছুটির মুখে দেশের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথে যে আকস্মিক ‘টাকা নেই’ সংকট দেখা দিল, তা কেবল সাধারণ গ্রাহকদের চরম ভোগান্তি ও উৎকণ্ঠার মধ্যেই ফেলেনি, বরং আমাদের সামগ্রিক আর্থিক খাতের প্রস্তুতি এবং দূরদর্শিতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উসকে দিয়েছে।
ঈদে টানা সাত দিনের ছুটির প্রাক্কালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এটিএম বুথগুলোর সামনে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন এবং শেষ পর্যন্ত ‘নো ক্যাশ’ লেখা দেখে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এক গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে। কোরবানির পশু কেনার জন্য যেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ টাকার নগদ লেনদেন প্রয়োজন, সেখানে বুথে টাকা না থাকা বা অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর ধরে গ্রাহকদের ডিজিটাল লেনদেন ও কার্ড-কালচারে অভ্যস্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছে। কিন্তু উৎসবের মতো একটি অতি সংবেদনশীল সময়ে যখন সেই কার্ডই অকেজো প্লাস্টিকের টুকরোয় পরিণত হয়, তখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর গ্রাহকের আস্থায় চিড় ধরা স্বাভাবিক। এই সংকট কেবল একক কোনো ব্যাংকের নয়, বরং ডাচ-বাংলা, ব্র্যাক, সিটি বা ইসলামী ব্যাংকের মতো শীর্ষস্থানীয় খুচরা ব্যাংকিং নেটওয়ার্কগুলোর বুথেই এই চিত্র সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে।
চাহিদা অনুযায়ী টাকার জোগান কম
এই নজিরবিহীন এটিএম সংকটের নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করলে দুটি প্রধান প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিকগত বিভ্রাট সামনে আসে। প্রথমত, উৎসবের দিনগুলোতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এটিএম নেটওয়ার্কে যে পরিমাণ দৈনিক নগদ টাকার চাহিদা থাকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তার সম্পূর্ণ জোগান পাওয়া যায়নি। উদাহরণস্বরূপ, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মতো বিশাল বুথ নেটওয়ার্কসমৃদ্ধ ব্যাংকের দৈনিক চাহিদাই থাকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। যেখানে ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) বা গ্রাহকদের জমা দেওয়া টাকা থেকে সংস্থান হচ্ছে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা, বাকি অর্ধেক টাকার জন্য ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভর করতে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ নগদ অর্থ সরবরাহ করতে না পারায় ব্যাংকগুলোর ভল্ট এবং বুথ দ্রুতই শূন্য হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সার্বক্ষণিক টাকা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় জোগানের অভাবে মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনার বাস্তবায়ন আলোর মুখ দেখেনি।
নতুন নোট এবং সফটওয়্যার-সংক্রান্ত জটিলতা
সংকটের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে চমকপ্রদ কারণটি একটি প্রযুক্তিগত সমন্বয়হীনতা। এবারের ঈদে বাজারে নতুন গভর্নরের স্বাক্ষরসংবলিত বিপুল পরিমাণ নতুন নোট ছাড়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া মনে হলেও, এটিএম এবং সিআরএম যন্ত্রগুলোর জন্য এটি তৈরি করেছে এক বড় জটিলতা।
এই আধুনিক যন্ত্রগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নির্দিষ্ট কিছু নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের (অপটিক্যাল ও ম্যাগনেটিক থ্রেড) মাধ্যমে নোট চিনে থাকে। নতুন গভর্নরের স্বাক্ষর বা নকশার সামান্য পরিবর্তনের কারণে যন্ত্রগুলোর সফটওয়্যার এই নোটগুলোকে ‘অপরিচিত’ বা জাল নোট হিসেবে চিহ্নিত করে আটকে দিচ্ছে অথবা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
একটি ব্যাংকের প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত নতুন কোনো নোটের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এটিএম বা সিআরএম যন্ত্রের সফটওয়্যারকে পরিচিত (ক্যালিব্রেট) করাতে কমপক্ষে চার সপ্তাহ সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এবার ব্যাংকগুলো একদিনও সময় পায়নি। আগের নকশাই বহাল থাকায় নীতিনির্ধারকেরা ভেবেছিলেন সমস্যা হবে না, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই সামান্য দূরদর্শিতার অভাবই লাখ লাখ গ্রাহকের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষ তখনই সার্থক হয়, যখন তা মানুষের সংকটের সময়ে নিরবচ্ছিন্ন সমাধান দিতে পারে। নতুন নোট ও যন্ত্রের এই অমিল আমাদের আর্থিক খাতের সমন্বয়হীনতার এক উজ্জ্বল, অথচ দুঃখজনক দৃষ্টান্ত।
আন্তঃব্যাংক সমন্বয়হীনতা ও ডিজিটাল ডিভাইড
ঈদের এই লম্বা ছুটিতে আরেকটি বড় সমস্যা দেখা গেছে আন্তঃব্যাংক কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে। এক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা তুলতে গিয়ে গ্রাহকেরা দেখছেন, সেবাটি বন্ধ বা অত্যন্ত সীমিত করা হয়েছে। যখন ব্যাংকগুলো নিজেদের গ্রাহকদেরই চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন তারা অন্যান্য ব্যাংকের গ্রাহকদের সেবা দেওয়াকে যৌক্তিকভাবেই দ্বিতীয় তালিকায় রাখছে।
এর ফলে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি)-এর যে মূল উদ্দেশ্য—যেকোনো ব্যাংকের কার্ড দিয়ে যেকোনো বুথ ব্যবহার করা—তা উৎসবের সময়ে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটি আমাদের আর্থিক খাতের এক বড় দুর্বলতা।
আমরা যখন একটি ‘ক্যাশলেস’ বা ‘লেস-ক্যাশ’ সোসাইটি গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন উৎসবের মুখে নগদ টাকার জন্য বুথে বুথে মানুষের এই হাহাকার প্রমাণ করে যে, আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামো এখনও কতটা ভঙ্গুর এবং আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কতটা অপূর্ণাঙ্গ।
করণীয় কী
এই ধরনের সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আর্থিক খাতকে সচল ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি—
১. কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখনই কোনো নতুন নোট বা নতুন স্বাক্ষরসংবলিত নোট বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেবে, তার অন্তত এক মাস আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তি বিভাগকে নমুনা নোট সরবরাহ করতে হবে। এতে করে ব্যাংকগুলো উৎসবের আগেই তাদের এটিএম ও সিআরএম সফটওয়্যার আপডেট করার পর্যাপ্ত সময় পাবে।
২. উৎসবের দিনগুলোতে, বিশেষ করে কোরবানি বা রোজার ঈদের আগে, ব্যাংকগুলোর এটিএম চ্যানেলের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি ডেডিকেটেড ক্যাশ সাপ্লাই লাইন বা বিশেষ তারল্য-সুবিধা চালু রাখা দরকার, যাতে কোনো বুথই টাকার অভাবে বন্ধ না থাকে।
৩. পশুর হাট এবং উৎসবের কেনাকাটায় নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমাতে ডিজিটাল পেমেন্ট, কিউআর কোড এবং এমএফএস (বিকাশ, রকেট, নগদ)-এর ব্যবহার আরও সহজ ও জনপ্রিয় করতে হবে। পশুর হাটগুলোতে যদি শতভাগ কিউআর কোড পেমেন্ট নিশ্চিত করা যায়, তবে এটিএম বুথের ওপর এই বিপুল চাপ এমনিতেই কমে আসবে।
৪. ছুটির দিনগুলোতে এটিএম নেটওয়ার্কের রিয়েল-টাইম মনিটরিং জোরদার করতে হবে। কোনো বুথে টাকা শেষ হওয়া বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ট সিস্টেমের মাধ্যমে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্যাশ-ইন-ট্রানজিট (সিআইটি) টিমকে অবহিত করে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো তার আর্থিক সেবার ওপর জনগণের অবিচল আস্থা। প্রযুক্তির ওপর ভরসা করে মানুষ যখন পকেটে নগদ টাকা রাখা কমিয়ে দিচ্ছে, তখন উৎসবের মুহূর্তে এটিএম বুথের এই ব্যর্থতা সেই আস্থায় ফাটল ধরায়।
ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ টাকা সরবরাহের দূরদর্শিতা—এই দুয়ের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় না থাকলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট ইকোনমির লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে। এবারের ঈদে গ্রাহকদের যে ভোগান্তি পোহাতে হলো, তা যেন আগামীতে আর কোনো উৎসবে ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ব্যাংক খাত ও নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে। সমস্যার সমাধান কোনো অলৌকিক বিষয় নয়; বরং এটি সঠিক সময়ে সঠিক সমন্বয়ের বিষয়।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
খবরটি শেয়ার করুন